করোনার হটস্পট হয়ে উঠেছে সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরা। ঈদ পরবর্তী সংক্রমণ বাড়ার যে শঙ্কা ছিল, সেটিই এখন সত্যি হতে চলেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬৬ জনের মধ্যে ৩৭ জনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
তবে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে জেলাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ভারতফেরত কারও মধ্যে এখনও ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসেইন শাফায়াত জানান, হঠাৎ করেই করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। হাসপাতালগুলোতে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে শিগগিরই আইসিইউ শয্যার সংকট দেখা দিতে পারে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৬৬ জনের নমুনার মধ্যে ৩৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শতকরা হিসাবে এটা প্রায় ৪৫ ভাগ। এ পর্যন্ত জেলায় এক হাজার ৫২৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪৬ জন।
করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ২০৭ জন। জেলায় বর্তমানে করোনা রোগী আছেন ১৬৬ জন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১০৮ জন ও সদর হাসপাতালে সাত জন করোনা রোগী ভর্তি আছেন। আইসিইউতে ভর্তি আছেন চার জন এবং করোনা সন্দেহে ৪৯ জন চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। এপ্রিলের চেয়ে মে মাসে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতফেরত ৩৩৭ জনের মধ্যে ১৭ জনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হলেও তাদের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট আছে কি না তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাদের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরে পাঠানো হলেও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
সিভিল সার্জন ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত বলেন, ঈদের পর থেকে দেশে সংক্রমণ বেড়েছে। ঈদের আগে থেকে ভারতফেরত পাসপোর্ট যাত্রীদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল, তখন কিন্তু এতো করোনা শনাক্ত হয়নি। ঈদের সময় সরকারের বিধিনিষেধ না মেনে শপিং ও গ্রামের বাড়ি যাওয়ার ঘটনায় ফের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এত কিছুর পরও এখানকার কেউ মাস্ক পরতে আগ্রহী নন। দিন দিন জেলার পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। মানুষ এখনই সতেচন না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে উপকূলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। গাদাগাদি হয়ে থাকার কারণে ওই এলাকায় করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে।
তিনি বলেন, ঈদের আগে জেলায় করোনার সংক্রমণের হার ছিল ১৩ শতাংশ। ঈদ পরবর্তী সংক্রমণের হার ১৭ শতাংশ বেড়ে গিয়ে ৪৫ শতাংশ হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে জেলার চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সাতক্ষীরাকে লকডাউনের আওতায় আনা যেতে পারে। এছাড়া সাতক্ষীরার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবায় সিট বাড়ানোসহ সদর হাসপাতালকে প্রয়োজনে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও জানান সিভিল সার্জন।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে যেভাবে করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে; তাতে আগের সব রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে। ভেঙে পড়তে পারে জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও। করোনা নিয়ন্ত্রণে সবাইকে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আনিসুর রহিম বলেন, কেউ স্বাস্থ্য বিধি মানছেন না, কারও মুখে মাস্ক নেই। ভারতফেরত অনেক মানুষকে আমাদের এখানে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। ঈদের সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকে এলাকায় এসেছিলেন, তাদের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি লক্ষ্য করা যায়নি। এসব কারণে আমাদের জেলা করোনার হটস্পট হয়ে উঠেছে। এখনই উদ্যোগ না নিলে সামনে আরও ভায়াবহ পরিস্থিতি হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ এখন পর্যন্ত জেলার মানুষের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করতে না পারলেও ধারণা করা যেতে পারে ইতোমধ্যে অনেকেই বহন করছেন। শ্যামনগর এবং কালিগঞ্জের অনেক মানুষ চোরাই পথে ভারতে যান। তারা কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানেন না এবং কোয়ারেন্টিনেও থাকেন না।
সাতক্ষীরা জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, ভারত থেকে এবং ঈদের সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসেছে। অনেকে তাদের শরীরে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বহন করে এনেছে।
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরাসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। কারণ ভারত থেকে আসা বাংলাদেশি যাত্রীরা চোরাইভাবে প্রবেশ করছে, বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের পর জেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের থাকার জায়গা নেই। তাদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা আরও কঠিন। এসব কারণে সংক্রমণ বাড়তে পারে।
এরই মধ্যে কলারোয়া উপজেলায় একদিনে ১১ জনের নমুনা থেকে সাতজনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। হঠাৎ উপজেলায় করোনা আক্রান্তের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কা দেখা দিয়েছে।