ভাসমান সেতু নির্মাণের পর থেকে বদলে গেছে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা গ্রামের ১৫ হাজার মানুষের জীবনযাত্রা। একসময় ছিল, যখন এখানকার বাসিন্দাদের স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল বা বাজারে আসতে হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। নৌকা ঘাটে আছে কিনা, মাঝি সুস্থ আছে কিনা, কতকিছুই ভাবতে হতো। কিন্তু এখন আর সেদিন নেই। যেকোনও সময় তারা খুব সহজেই পার হতে পারে বিশাল ঝাঁপা বাঁওড়টি, যেতে পারে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
২০১৮ সালে স্থানীয় লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নির্মিত হয় দেশের প্রথম ভাসমান সেতু ‘ঝাঁপা বাঁওড় ভাসমান সেতু’। অবসান হয় স্থানীয়দের কষ্টকর যাতায়াত।
সেতুকে কেন্দ্র করে ঝাঁপা এলাকা পরিণত হয় পিকনিক স্পটে। সেতু দেখতে সেখানে ভিড় জমান দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। আর এ অবস্থায় সেখানে গড়ে উঠেছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা, রকমারি পণ্য বিক্রির নানা দোকান। স্থায়ীভাবে গড়ে উঠেছে বেশকিছু খাবারের দোকানও। প্রতিদিন বিকালে সেখানে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। এছাড়া প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁওড়টির অংশবিশেষ ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে নৌকার ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে জীবিকারও একটা উপায় তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের।
তবে, দীর্ঘদিনের ব্যবহারে ঝাঁপা বাঁওড়ের ভাসমান সেতুর বেশকিছু স্থানে দেখা দিয়েছে ছিদ্র, ভেঙে পড়েছে কিছু রেলিং। মরিচা ধরে বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সেতু ব্যবহারকারী ঝাঁপা গ্রামের কলেজছাত্র আরিফুল ইসলাম বলেন, বছর চার আগেও আমাদের পারাপারে ব্যাপক সমস্যা হতো। নৌকার জন্যে অপেক্ষা করতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিশেষ করে অসুস্থদের হাসপাতালে নিতে ভোগান্তির শেষ ছিল না। এখন আর সে সব কোনও সমস্যা নেই।
ঝাঁপা গ্রামের বাসিন্দা রুহুল কুদ্দুস বলেন, আগে বর্ষার সময় যাতায়াতে নানা বেগ পোহাতে হতো; ভয় করতো। এই সেতু নির্মাণের পর এখন শীত, বর্ষা কোনও সমস্যা নেই।
বাঁওড়ের অপর পাড় অর্থাৎ ঝাঁপা গ্রামের বাসিন্দা শাহজামাল ইসলাম মনা। তার দোকানের নাম মনা মিয়ার চটপটি ফুসকা অ্যান্ড কফি হাউজ। সেতু চালুর পর থেকেই একটি চটপটি, ফুসকা আর কফি-চায়ের দোকান দেন তিনি।
মনা বলেন, ভাসমান সেতু ও বঙ্গবন্ধু ভাসমান সেতুর মাঝখানে যতগুলো চটপটির দোকান রয়েছে- সবার চেয়ে আমার দোকানে ভালো বিক্রি হয়। আমাদের এখানে বেশ ভাল জায়গা রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন আসেন; ঘোরা-ফেরা করেন। কোনও চাঁদাবাজ নেই, নেই কোনও বখাটে। সুন্দর পরিবেশে ছেলেমেয়েরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে, খাওয়া-দাওয়াও করে।
তিনি জানান, কিছু টাকা ইনভেস্ট করেছিলেন প্রথমদিকে। আজ দোকানের সাজসজ্জা অবয়ব দেখে বোঝা যায, তিনি ভালো ব্যবসা করছেন।
এদিকে, বাঁওড়ের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা ভ্রমণপিপাসুদের নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা রাখা আছে। মো. নয়ন গাজী নামে নৌকার এক মাঝি বলেন, বাঁওড়ের নৌকায় মাথাপিছু ত্রিশ টাকা এবং একটি নৌকা রিজার্ভ ভাড়া নেওয়া হয় সাড়ে তিনশ’ টাকা। বাঁওড়ের ভাসমান সেতু এবং পরে নির্মিত বঙ্গবন্ধু ভাসমান সেতুর মাঝখানের জায়গায় নৌকায় ঘোরা যায়।
এদিকে, বাঁওড়ের পরে সেতু নির্মাণ হওয়ার পর ঝাঁপা এলাকায় তৈরি হয়েছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা। সেখানে অজগর, কুমির, গরিলা, বানর, বিভিন্ন জাতের পাখি, শজারুসহ ৩০ রকমের প্রাণী রয়েছে। ২০ টাকা টিকিটে এই চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করা যায়। কিন্তু করোনাকাল ও বর্ষার কারণে দর্শনার্থী খুব কম বলে জানিয়েছেন চিড়িয়াখানার দায়িত্বে থাকা রবিউল ইসলাম।
সেতুর সংস্কার ও দেখভালের জন্য রয়েছে একটি কমিটি। ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশন নামে ওই কমিটির সভাপিত ডা. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সেতু নির্মাণে প্রথমদিকে আমাদের ব্যয় হয় ৭০ লাখ টাকার বেশি। এরপর সেতুর দু'পাড় সংস্কার করা হয়। এক পাড় এখনও ইট-কাঠ-বাঁশ দিয়ে সংযোগ করা। অপর প্রান্ত ঢালাই করা। এতে পাঁচ লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়। তবে সেতু সংস্কারে আমরা সরকারি কোনও সহায়তা পাইনি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েক জায়গায় ক্ষতি হয়েছে। আমরা সে সব স্থান সংস্কার করেছি। নতুন করে সেতু ৮ ফুটের স্থানে ১২ ফুট চওড়া করে সংযোজন করেছি। আমাদের সেতুর এই অংশ প্রতি ২০ ফুটে খরচ হচ্ছে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। এভাবে ৫৩ টি সংযোগ আমাদের করতে হবে।
এদিকে, সেতুটি নির্মাণের পরপরই আরেকটি ভাসমান সেতু বানানো হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু নামে পরিচিত সেতুটি বানাতেও স্থানীয় লোকজনের আর্থিক সহায়তা তেন। সেতুটি চওড়া ১২ ফুট এবং এর দৈর্ঘ্য ৯০০ ফুটের কিছু বেশি। এই সেতু দিয়ে ট্যাক্সি, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল ইত্যাদি চলাচল করে। তবে, অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষেত্রে তারা কোনও টাকা পয়সা নেন না।