খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে মায়ের লাশ আটকে রেখে দুই ছেলেকে পুলিশে দেওয়ার ১৩ ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রবিবার (১০ এপ্রিল) বিকালে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বাদ মাগরিব গোয়ালখালী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এর আগে দৌলতপুর সবুজ সংঘ মাঠে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুরের পাবলা কারিকরপাড়ার মাওলানা আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী পিয়ারুন্নেছা (৫৫) শনিবার দিবাগত রাতে খুমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। চিকিৎসার অবহেলায় মায়ের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ এনে ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরুল হাসানের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয় মো. মোস্তাকিমের। এ ঘটনায় পিয়ারুন্নেছার অপর দুই ছেলেকে আটকে রেখে পুলিশের হাতে তুলে দেন চিকিৎসকরা।
আরও পড়ুন: মায়ের লাশ আটকে সন্তানদের পুলিশে দেওয়ার অভিযোগ
মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমার স্ত্রীর বুকে ব্যথা ও পায়খানা-প্রস্রাব না হওয়ায় ৮ এপ্রিল রাতে খুলনা মেডিক্যালের তৃতীয় তলায় ১১-১২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। শনিবার রাতে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আমার ছেলে চিকিৎসককে ডাকতে গেলে কেউ আসেননি। উল্টো রোগীকে নিয়ে যেতে বলেন। সে মোটা মানুষ। তার ওপর অসুস্থ। তাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না বলে চিকিৎসকদের জানানো হয়। কিন্তু কোনও চিকিৎসক আসেননি। ওই রাতেই ছটফট করতে করতে আমার স্ত্রী মারা যান।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলে মোস্তাকিম গিয়ে চিকিৎসকের কাছে জানতে চায়, তারা কেন দেখতে আসলেন না। এ নিয়ে আমার ছেলের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার এক পর্যায়ে চিকিৎসকের হাতাহাতি হয়। আমি বিষয়টি জানতে পেরে চিকিৎসকের হাত-পা ধরে মাফ চাই। বলি, আপনারা তো বোঝেন মা মারা গেছে তাই ওদের মাথা ঠিক নেই, আপনারা মাফ করে দেন। এ সময় একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক আমার গায়েও হাত তোলেন এবং অপর দুই ছেলে তরিকুল ইসলাম কাবির ও সাদ্দাম হোসেনকে পুলিশে দেন। আর আমার স্ত্রীর লাশ হাসপাতালে আটকে রাখে। খবর পেয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শামছুদ্দিন আহম্মেদ প্রিন্স এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আসলে তাদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।’
আব্দুর রাজ্জাকের ভাইয়ের ছেলে মো. মামুন বলেন, ‘চাচির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাই মোস্তাকিমের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরুল হাসান ও তার সঙ্গীদের সামান্য হাতাহাতি হয়। এ ঘটনায় তারা অপর চাচাতো ভাই সাদ্দামকে মেরে জামা কাপড় ছিঁড়ে ফেলে এবং তরিকুল ইসলাম কাবিরকে গালাগালি করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। আমরা চাচির লাশের কাছে যেতে চাইলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেলা ১১টা পর্যন্ত ভেতরে যেতে দেয়নি।’
তরিকুল ইসলাম কাবির বলেন, ‘রাতে মা ছটফট করতে থাকে। আমার ভাই বার বার যাওয়ার পরও ডাক্তার আসেনি। মাকে সাথে নিয়ে তার রুমে আসতে বলে। হাসপাতালে থাকা অন্যান্য রোগীর স্বজনরা অনেক অনুরোধ করার পর ডাক্তার মাকে দেখতে আসেন। কিন্তু মা ততক্ষণে মারা গেছেন। এরপর আমার ছোট ভাই উত্তেজিত হয়ে ডাক্তারদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জাড়ায়। পরে এসে ছোট ভাইয়ের পক্ষ থেকে আমি ও আমার আরেক ঢাকা থেকে আসা অসুস্থ ভাই মাফ চাই। কিন্তু তারা আমার অসুস্থ ভাইটিকেও মারধর করে। এমনকি আমার বৃদ্ধ বাবাকেও ইন্টার্ন টিকিৎসকরা মারধর করে। পরে অন্যায়ভাবে আমাদের পুলিশে ধরিয়ে দেয়।’
অভিযুক্ত ইন্টার্ন চিকিৎসক কামরুল হাসান বলেন, ‘আমি তো পরে এসেছি। আমি ওই ইউনিটের ডাক্তার নই। মনিশ কান্তি দাস ও প্রীতম কর্মকারের সঙ্গে রোগীর স্বজনের হাতাহাতি হয়েছে। আমি ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের পক্ষ থেকে এসে কথা বলেছি। আমরা অনেক আগেই লাশ ডিসচার্জ করে দিয়েছি।’
খুমেক হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার বলেন, মানুষ মারা গেলে একটি প্রক্রিয়া আছে। সে অনুযায়ী লাশ ছাড়তে হয়। লাশ আটকে রাখার কিছু নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তাদের নিয়ে যায়। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কোনও জিডি বা মামলা করিনি।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী প্রতিবাদ ও সড়ক অবোরোধ করে। ঘটনার ১৩ ঘণ্টা পর রবিবার বিকাল ৪টায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর থানায় আটক তরিকুল ইসলাম কাবির ও সাদ্দাম হোসেনকেও ছেড়ে দেয় পুলিশ।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মমতাজুল হক বলেন, চিকিৎসককে আঘাত করার অভিযোগে দুই জনকে রবিবার সকালে থানায় সোপর্দ করেছিলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদেরকে এনে হাজতে রাখা হয়। অভিযোগ জমা না হওয়ায় বিকাল ৪টার দিকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।