বাস ও লঞ্চের পর শুক্রবার (২১ অক্টোবর) রাতে খুলনা শহরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী খেয়াঘাটগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও বাধা পেরিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হচ্ছেন বিভাগের বিভিন্ন জেলার বিএনপির নেতা-কর্মীরা। রাত থেকে বেশিরভাগ নেতা-কর্মী ট্রেনে ও ট্রলারে আসছেন। গণসমাবেশে যোগ দিতে রাতেই খুলনায় পৌঁছেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা।
খুলনার সমাবেশস্থল খুলনা নগরের ডাকবাংলো ও ফেরিঘাট মোড়ের মাঝামাঝি সোনালী ব্যাংক চত্বরে রাতে মঞ্চ ঘিরে জনতার অবস্থান শুরু হয়। মঞ্চের সামনে অবস্থান নিয়ে নেতা-কর্মীরা রাতভর গানে-স্লোগানে মেতে ওঠেন। অনেকে বক্তৃতা করে ও গল্প-আড্ডায় রাত কাটিয়েছেন। ভোর থেকে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হচ্ছেন নেতা-কর্মীরা। সমাবেশ মঞ্চ থেকে শিববাড়ি মোড় পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার এলাকাজুড়ে টানানো হয়েছে ১২০টি মাইক। আটটি পয়েন্টে বসানো হয়েছে প্রজেক্টর।
আরও পড়ুন: খুলনায় লঞ্চ চলাচলও বন্ধ
খুলনা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব শফিকুল আলম তুহিন জানান, আজকের সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। সমাবেশের সময় ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি করা হবে। এছাড়া সমাবেশের শৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করবেন ৪০০ স্বেচ্ছাসেবক।
তিনি আরও জানান, বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে শুক্রবার রাতেই বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে নেতা-কর্মীরা এসে সমাবেশস্থলে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের রাত কেটেছে গল্প-আড্ডা, গান ও স্লোগানে। অনেকেই সময় কাটাতে লুডুসহ বিভিন্ন খেলায় মেতেছেন। অনেকে ফেসবুকে লাইভ দিচ্ছেন, সেলফি তুলছেন। সবমিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে সমাবেশস্থলে।
আরও পড়ুন: ক্রিকেট খেলছেন পরিবহন শ্রমিকরা, সীমাহীন ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা বিএনপি কর্মী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর গল্প করে রাত কাটিয়েছি। এখানে আসা অনেকেই গান করেছেন। আবার কেউ কেউ ঘুমিয়েছেন। সবমিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।’
কুষ্টিয়া থেকে আসা বিএনপি কর্মী অনুপ মন্ডল বলেন, ‘আমরা অনেকেই এসেছি। হোটেলে তো এতো মানুষের সিট মিলবে না। তাই সমাবেশস্থলে অবস্থান নিয়েছি। বয়স্করা শুয়ে ছিলেন। আর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা গল্প করেছেন। অনেকে সময় কাটাতে গান গাইছেন। খুব ভালো একটা পরিবেশ বিরাজ করছে।’
বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সমাবেশ বাস্তবায়নে গঠিত মিডিয়া উপ-কমিটির আহ্বায়ক এহতেশামুল হক শাওন বলেন, ‘শত বাধা উপেক্ষা করে সমাবেশস্থলে এসে নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত। বহু বাধা পেরিয়ে এখানে আসতে পেরে তারা আনন্দিত। অনেক কষ্ট করে তারা এসেছেন। রাতে শুয়ে-বসে, আড্ডা-গল্পে, বক্তব্য শুনে তাদের সময় কেটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাত থেকে মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা গণসমাবেশ স্থলে আসছেন। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমাবেশস্থলে পরিদর্শন করে হোটেলে যান। এরপর সেখানে মঞ্চ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। সমাবেশ ঘিরে রয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা। আবার রয়েছে ভোগান্তিও। বন্ধ রয়েছে বাস, লঞ্চ ও খেয়াঘাট। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। দূর-দূরান্ত থেকে সমাবেশে আসতে ভরসা করতে হচ্ছে ট্রেন, ট্রলার, ইজিবাইক, সিএনজি অটোরিকশা ও ভ্যানের ওপর। অনেকে হেঁটে সমাবেশস্থলে আসছেন।’
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, সমাবেশে যাতে নেতা-কর্মীরা অংশ নিতে না পারেন তাই বন্ধ বাস, লঞ্চ ও খেয়াঘাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ট্রেনে পাথর ছোড়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘খুলনায় বিএনপির সমাবেশ বাধাগ্রস্ত করার ইচ্ছে আ.লীগের নেই’
দলটির নেতা-কর্মীরা জানান, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর ও মেহেরপুর থেকে তারা ট্রেনে খুলনায় আসছেন। নড়াইল, সাতক্ষীরা, কয়রা, পাইকগাছা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা এলাকার নেতা-কর্মীরা ট্রলার, ইজিবাইকসহ নানা কৌশলে খুলনায় প্রবেশ করছেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস খুলনা স্টেশনে এসে পৌঁছান। ট্রেন থামামাত্রই কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলার নেতা-কর্মীরা মিছিল-স্লোগান দিতে দিতে প্ল্যাটফর্ম হয়ে সমাবেশ স্থলে যোগ দেন।
চুয়াডাঙ্গা পারকৃষ্ণপুর মদনা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক বিপ্লব বলেন, ‘তিন দিন আগে স্টেশনে গিয়েছিলাম, কিন্তু টিকিট দেয়নি। আমরা বলেছি, বিভাগীয় সমাবেশে প্রয়োজনে হেঁটে যাবো। রাতে ট্রেনে এসেছি। খুলনায় আসার পথে দুর্বৃত্তরা ট্রেন পাথর নিক্ষেপ করে। এতে আমাদের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।’
দর্শনা পৌরসভার যুবদল সাবেক সভাপতি মুকুল সাহা বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গার প্রতিটি ওয়ার্ড, থানা, পৌর ও ইউনিয়ন থেকে হাজার হাজার লোক নিয়ে এই গণসমাবেশ সফলে খুলনায় এসেছি। সবাই ট্রেনের টিকিট কেটেই এসেছি। পুলিশ বাধা দিয়েছে, অনেককে নামিয়ে দিয়েছে। সব বাধা উপেক্ষা করে আমরা খুলনায় এসেছি।’
বিএনপি কর্মী আহসান হাবিব লিটন বলেন, ‘আমরা বাস ঠিক করেছিলাম আসার জন্য। বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শত বাধার মধ্যেও আমরা ট্রেনে করে এসেছি। এত মানুষের তো আর হোটেলে থাকা সম্ভব নয়।’
কুষ্টিয়ার বিএনপি কর্মী সোহেল বলেন, ‘বাস বন্ধ থাকায় নেতা-কর্মী ট্রেনে এসেছেন। আগেও অনেকে এসেছেন। আরও আসছেন।’
কয়রা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এ হাসান জানান, খুলনা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরবর্তী সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলা থেকে খুলনার সমাবেশে যোগ দিতে ট্রলারে নদীপথে রাতে রওনা দেন তিনি। সঙ্গে অনেক নেতা-কর্মী রয়েছেন।
খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘বাধা উপেক্ষা করে নেতা-কর্মীরা খুলনায় আসছেন। কোনোভাবেই গণসমাবেশ ঠেকানো যাবে না। যেকোনও মূল্যে সমাবেশ সফল করা হবে।’
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন উপজেলার নেতা-কর্মীরা ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, ভ্যান, ট্রলারে সমাবেশস্থলে যাচ্ছেন। নড়াইল থেকে ১২ হাজারের মতো নেতা-কর্মী খুলনার মহাসমাবেশে সকাল নাগাদ যোগ দেবেন।’
উল্লেখ্য, খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি, নির্বাচনকালীন সরকার, জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, পুলিশের গুলিতে নেতাকর্মী হত্যা, হামলা এবং মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে আয়োজন করা হয়েছে এই গণসমাবেশ। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করবেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্য রাখবেন কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় নেতৃবৃন্দ।