খুলনার উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’র প্রভাবে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। এতে আতঙ্ক তৈরি হলেও ঝুঁকিপূর্ণ লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন না। আশ্রয়হীন মানুষগুলোও আশ্রয় কেন্দ্রে না গিয়ে শেষ সম্বল আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইছেন।
খুলনার মদিনাবাদ লঞ্চঘাট এলাকার চরে বসবাস করা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা সোমবার (২৪ অক্টোবর) বিকালে জরিনা বেগম জানান, ৩০ বছর ধরে তিনি এখানে চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। যাওয়ার আর কোনও জায়গা নেই। আতঙ্ক ও উদ্বেগ নিয়েই এখানে থাকছেন তিনি। ঝড়ের সময় রাতে ঘুম হয় না। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেলে রাস্তায় থাকেন, পানি নেমে গেলে ঘরে ফেরেন। আশ্রয়কেন্দ্র দূরে হওয়ায় এ আশ্রয়ের শেষ স্থান ছেড়ে সেখানে যান না। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এখানে তার জীবন চলছে। নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরেন। সময় বিশেষ ভিন্ন কাজও করেন।
গোবিন্দপুর এলাকার নদীর চরে খুপড়ি ঘরের বেবী বেগম জানান, ছেলেকে নিয়ে এখানেই বাস করছেন। স্বামী সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেন। এক সপ্তাহ হলো সুন্দরবনে গেছেন। আজও ফেরেননি। ঝড় হলে ভয় লাগে। কিন্তু নদীর তীরেই অবস্থান করতে হয়। বেশি সমস্যা হলে পাশের স্কুলে ওঠেন। সেখান থেকে এই বাসা দেখা যায়। তাই আশ্রয়কেন্দ্রে যান না।
স্থানীয় নুরুল ইসলাম বলেন, মহারাজপুর ইউনিয়নের শিমলার আইট খেজুরডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারের নলকূপটি নষ্ট। ফলে সুপেয় পানির সমস্যা রয়েছে। ঝড়ে বাঁধ ভেঙে পুরো এলাকা লবণ পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। আশ্রয়কেন্দ্রের কলটি নষ্ট থাকায় খাবার পানির সমস্যা হচ্ছে। শুকনো খাবারে পানি দরকার হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, কয়রা উপজেলায় পাউবোর ১৫৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে ২১ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ ও ১২ কিলোমিটার অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
খুলনার কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর বাতাস ও বৃষ্টি কমে আসে। এই কারণে লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে কম আসে। তবে রাত ৮টা পর্যন্ত ১০ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশ করেছে। ঝড় বাড়লে লোকজন আশ্রয় কেন্দ্রে ভিড় করবে।
তিনি বলেন, কয়রার হরিণখোলা ও গাতিরঘেরির বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। স্থানীয়রা কিছুটা মেরামত করলেও ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। উপজেলার বগালী ইউনিয়নের হোগলা, মহারাজপুর ইউনিয়নের পবনা, দোশহালিয়া, কয়রা সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, ঘাটাখালী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে।
কয়রা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকুনুজ্জামান বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কয়রাজুড়ে ১১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বিদ্যালয় ভবন, পাকা ও নিরাপদ স্থাপনা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নিরাপদ পানি ও খাদ্য মজুত রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষজনকে শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে।
পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, ১০৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫৯ হাজার মানুষের ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত এখানে সাড়ে তিন হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। যার দুই-তৃতীয়াংশ নারী ও শিশু।
বলেন, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে তিনি নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছেন। একই পরিবারের পুরুষ সদস্যদের আশ্রয়কেন্দ্রে ভিন্ন অবস্থানে রাখা হয়েছে।
খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার সরকার জানান, খুলনা জেলার চার উপকূলীয় উপজেলার জন্য জেলা প্রশাসন জি-আর এর ৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করেছেন। বিকাল থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া চার উপজেলার জন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, কয়রায় ১০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ২ লাখ টাকা, ৪০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, পাইকগাছায় ৬ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ নগদ টাকা, ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, দাকোপে ১০ মেট্রিক টন চাল, দেড় লাখ টাকা, ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও বটিয়াঘাটায় ৪ মেট্রিক টন চাল, ৫০ হাজার নগদ টাকা ও ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ করা হয়েছে। পরিবারপ্রতি ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ লিটার সয়াবিন, ১ কেজি চিনি ও ১ কেজি লবণ বরাদ্দ করা হয়েছে।
খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, জেলায় ৫৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে দাকোপে ১১৮টি, বাটিয়াঘাটায় ২৩টি, ডুমুরিয়ায় ২৫টি, কয়রায় ১১৮টি, পাইকগাছায় ১০৮টি, তেরখাদায় ২২টি, রূপসায় ৩৮টি, ফুলতলায় ২৫টি ও দিঘলিয়া উপজেলায় ৭১টি রয়েছে। জেলার প্রতিটি উপজেলায় পাঁচটি এবং প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মোট ১১৬টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদানের জন্য ডাক্তার, সেবিকা, ওষুধপত্র ও অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে কয়রায় বাঁধের ১১ স্থান ভেঙে প্লাবিত হয়। গাতিরঘেরি ও দশহালিয়া তিন মাসেরও বেশি সময় পানিতে নিমজ্জিত ছিল। ২০২০ সালের ২০ মে সুপার সাইক্লোন আম্ফানের আঘাতে বেশ কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়। ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলায় উপজেলার অধিকাংশ স্থান ডুবে যায়।