সাতক্ষীরার বৈরাগীরচকে জমি ১৬৪.৭৭ একর। এই জমির ইতিহাস বেশ পুরোনো। তবে সারসংক্ষেপ হলো—তফসিলি জমি অন্যায়ভাবে ভোগদখল করতে একদিকে ভূমিদস্যুদের কবলার নামে ভুয়া দলিলে দখল নেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে ভুয়া কাগজপত্র করে খুলনা সাব জজ আদালতে সরকারকে বিবাদী করে দেওয়ানি মামলা, যা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। মূলত সম্পূর্ণ জমিই অর্পিত সম্পত্তি। এর মধ্যে ৫৭ একর ‘ক’ তফসিলভুক্ত এবং ১০৭ একর “খ” তফসিলভুক্ত জমি। এ জমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ১৯৯৮ সালে গুলিতে প্রাণ দেন ভূমিহীন জায়েদা। আরও ২২৯ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে রক্তে রঞ্জিত করেন এ জমি। সেই থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে স্থায়ী দলিল পেয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ভূমিহীনদের। ২০০৪ সাল থেকে এ জমিতে বসবাসরত ১৩৬টি পরিবারের মধ্যে ৫৪টি পরিবার পেয়েছেন এ দলিল। তারা এখন স্বাবলম্বিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। খাস জমির স্থায়ী বন্দোবস্ত পেয়ে তাদের জীবন-জীবিকায় এসেছে নতুন মাত্রা।
আশরাফুল ও রহমত আলী মোটরবাইক চালিয়ে প্রতিদিন ৫০০/৫৫০ টাকা আয় করছেন। পাশাপাশি আশরাফুল কাঁকড়ার ব্যবসাও করছেন। রহমত আলী নিজের জমিতে কাজ শেষে অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে বাড়তি আয় করছেন। রমজান বাগদা চিংড়ি কিনে মাছের ডিপোতে বিক্রি শুরু করেছেন। মনতাজ ও কুদ্দুস মুদিদোকান চালাচ্ছে। সিরাজুল এবং ফরিদা ছাগলের খামার করেছেন। রহমত, ইদ্রিস, কুদ্দুসের ১০ থেকে ২০টি করে ভেড়া রয়েছে। প্রত্যেকেই মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বাড়তি আয় করছেন। সবার সন্তান স্কুলে যাচ্ছে। আশরাফুলের ছেলে নলতা কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে, মোশারফ ও ওহাব আলীর মেয়ে মাধ্যমিকে পড়ছে। কাদের নিজ চেষ্টায় ২০১২ সালে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন “বৈরাগিরচক আহসানিয়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়”। স্কুলে ৬৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
ভূমিদস্যুদের দখলে থাকা এই জমিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২০০৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে ১৩৬টি ভূমিহীন পরিবার বসবাস করতে শুরু করে। তাদের এই জমির নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ১৯৯৮ সালের ১৮ আগস্ট সাতক্ষীরার দেবীশহর মাঠে ভূমিহীনদের এক সমাবেশে খাসজমি বিতরণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর এই খাসজমি বিতরণের ঘোষণার কারণ ছিল ১৯৯৮ সালের ২৭ জুলাই দেবহাটা-কালিগঞ্জ উপজেলার ৯টি ভূমিহীন পল্লীতে বসবাসরত ভূমিহীনদের সাথে ভূমিদস্যুদের সংঘর্ষ। সংঘর্ষে জায়েদা নামে এক ভূমিহীন নেত্রী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান এবং ২২৯ জন গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি ১৯৯৮ সালের ১৮ আগস্ট ভূমিহীনদের মাঝে এসে এই জমি বিতরণের ঘোষণা দেন। এরপর ১৩৬টি পরিবার বৈরাগীরচকে অবস্থান নেয়। তবে তারা তাদের জীবন আশা-নিরাশার মাঝামাঝি দাড় করায়।
২০০৪ সাল থেকে বৈরাগীরচকে বসবাসরত আব্দুল কাদের বলেন, এই জমিই আমাদের ভরসা। জীবন গেলেও জমি ছাড়বো না। জীবন বাঁচাতে এই জমিতে এসে ঘর বেঁধেছি। দিনমজুরি করেছি। জমিতে মাছ চাষ করতে থাকি। হাঁস-মুরগি এবং ছাগল পালন করে স্ত্রী। দুইটা ছেলে আমাদের। এই জমির আয় থেকে বড় ছেলেকে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে নিতে পেরেছি। পড়াশোনার পাশাপাশি সে প্যাথলজিস্ট হিসাবে পার্টটাইম কাজও করছে। ছোট ছেলেটি গ্রামের নিকটবর্তী মাদ্রাসায় বোর্ডিংয়ে থাকে। আমি এই জমি ব্যবহার করে ওদেরকে লেখাপড়া শিখিয়েছি। তবে সর্বক্ষণ একটা ভীতি নিয়ে জীবন কাটিয়েছি।”
দীর্ঘ অপেক্ষা, লড়াই, সংগ্রাম আর আইনের মারপ্যাঁচ উৎরে কাদের ২০১৯ সালে ১ একর জমি স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত পান। জমির স্থায়ী দলিল তার জীবনের গতি পাল্টে দিয়েছে। বহুমুখী আয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে। কাদেরের ভাষায়, জমির এক মাথায় বাড়ি তৈরি করে বসবাস করছি। বাকি জমিতে মাছ চাষ করি। মাছ থেকে প্রতিবছর ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা লাভ হয়। মাঝে মাঝে দিনমজুরি দিয়ে মাসে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা আয় করছি। হাঁস, মুরগি ও ছাগল বিক্রি করে বছরে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। তবে আয়ের টাকা খরচও করছি। জমির স্থায়ী দলিল আমাকে ব্যাংক ঋণ পেতে সহায়তা করেছে। আমার এখন সুখের দিন।
শৈশবে আব্দুল কাদের ৫ ভাই ৪ বোন আর বাবা-মার সাথে সাতক্ষীরার ইন্দ্রনগর গ্রামে থাকতেন। বাবা উত্তরাধিকার সূত্রে মাত্র ৩ শতক জমি পেয়েছিলেন। থাকা আর খাওয়ার কষ্ট নিয়ে বড় হয়েছেন। মনে আছে, তিন বেলা খাবার কোনদিনই তাদের জুটতো না। তার মা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ভাতের মাড় এনে তাদের খাওয়াতেন। প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে ভাই বোনেরা ভাগাভাগি করে আধা পেটা খেয়ে থাকতেন। কাদেরের লেখাপড়ার খুব আগ্রহ ছিল। বই, খাতা, কলম চেয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যেতেন। ছোটবেলা থেকেই দিনমজুরি দিতেন। নিজের আয় থেকে কিছুটা লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। কাদেরের খুব আশা ছিল, বিএ, এম-এ পাস করবেন। পরিবারকে সাহায্য করার জন্য চাকরি করবেন। চাকরির খোঁজে ঢাকা গেলেন। তখন ১৫ হাজার টাকা ঘুস দিলে একটি কোম্পানি চাকরি দিবে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু টাকা ছিল না, শেষে আবার গ্রামে ফিরে আসেন কাদের। ২০০১ সালে বাবা-মা বিয়ে দিয়ে তার কাঁধে বোঝা তুলে দিলেন। থাকার জায়গা নেই, খাওয়ার কষ্ট। ভূমিহীন নেতাদের সহযোগিতায় বৈরাগীরচকে ভূমিদস্যুদের দখলীয় জমির মধ্যে আমি ১ একর জায়গার দখল পান তিনি। জীবন বাজি রেখে অবশেষে জমির স্থায়ী দলিল পেয়েছেন তিনি। সেই অনুপ্রেরণা নিয়ে ভূমিহীনদের সংগঠিত করলেন। নেতাদের পরামর্শ মতো চলতে থাকলেন। দিনে অন্যের জমিতে কাজ করে যা টাকা পান তা দিয়ে সংসার চালিয়ে নিজের দখলীয় জমিতে বাকি টাকার মাছ ছাড়েন।
মোশারফ হোসেন বলেন, বৈরাগীরচকের ভূমিহীনদের জীবন-জীবিকা এখন বৈচিত্র্যময়। অনেকেই এখন মাছ চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা করছেন, কেউ পোল্ট্রি ফার্ম করেছেন। অনেকেই ছাগল ও ভেড়া পালন করছেন, কেউ কেউ মোটরসাইকেল কিনে ভাড়ায় চালাচ্ছেন। অনেকে চিংড়ি এবং সাদা মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ করছেন।
ওহাব আলী বলেন, বাবুরাবাদে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। বৈরাগীরচককে আলোকিত করতে ১২৬টি পরিবার মিটারের জন্য আবেদন করেছেন। এলাকায় খাবার পানির প্রচণ্ড সমস্যা আছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হয়, অন্য সময় পানি কিনতে হয়। এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ।