চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় একটানা প্রায় দুই সপ্তাহ দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। গ্রীষ্মে তীব্র গরম আর শীতে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমের এই জেলা দুই মৌসুমে সংবাদের শিরোনাম হয়। কিন্তু এই জেলায় এত বেশি গরম কেন অনুভূত হয়, সে প্রশ্ন সবার মনে। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূপ্রকৃতিসহ ছয়টি কারণে চুয়াডাঙ্গায় গরমের তীব্রতা বেশি।
সর্বশেষ শনিবার (২৯ এপ্রিল) চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ সেলসিয়াস। এর আগে ২ এপ্রিল ৩৩ দশমিক ৪, ৩ এপ্রিল ৩৫ দশমিক ৫, ৪ এপ্রিল ৩৭, ৫ এপ্রিল ৩৭, ৬ এপ্রিল ৩৭ দশমিক ৫, ৭ এপ্রিল ৩৮, ৮ এপ্রিল ৩৮.৫, ৯ এপ্রিল ৩৯, ১০ এপ্রিল ৩৯ দশমিক ২, ১১ এপ্রিল ৩৯ দশমিক ৫, ১২ এপ্রিল ৩৯ দশমিক ৭, ১৩ এপ্রিল ৪১, ১৪ এপ্রিল ৪১ দশমিক ৭, ১৫ এপ্রিল ৪২ দশমিক ২, ১৬ এপ্রিল ৪১ দশমিক ৮ ও ১৭ এপ্রিল ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়। এর আগে ২০১৪ সালে চুয়াডাঙ্গায় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২১ সালে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। গত ৯ বছরের মধ্যে এবার ৪২ ডিগ্রি তাপমাত্রা উঠেছে।
পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, অনাবৃষ্টি, যত্রতত্র শিল্প-কলকারখানা গড়ে ওঠা, আবাদি জমি ও পরিবেশ ধ্বংস এবং মনুষ্যসৃষ্ট সংকট এর মূল কারণ। এসব কারণে গ্রীষ্মে তীব্র গরম আর শীতে প্রচণ্ড ঠান্ডা অনুভূত হয়।
তবে কর্কটক্রান্তি রেখা চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে অতিক্রম করায় তীব্র গরমের মূল কারণ বলে জানালেন খুলনা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ। তিনি বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গা, যশোর, ঈশ্বরদী ও রাজশাহীর ওপর দিয়ে গেছে কর্কটক্রান্তি রেখা। এ কারণে গ্রীষ্মে তীব্র গরম আর শীতে প্রচণ্ড ঠান্ডা অনুভূত হয়। বায়ুমণ্ডলে আবহাওয়ার ওপরের লেয়ার এখানে সহজে পরিবর্তন হয় না। ভৌগোলিক পরিবেশ ও বায়ুমন্ডলের নিয়মে এখানে এমন আবহাওয়া চলতে থাকবে। তবে বৃষ্টি হলে বা শীত এলে আবহাওয়া পরিবর্তন হবে।’
একই কথা বলেছেন চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মূল কারণ ভোগলিক অবস্থান। পাশাপাশি এখানে নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়া, কম বৃষ্টিপাত হওয়া, আবাদি জমি ও পরিবেশ ধ্বংস এবং যত্রতত্র শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠায় তাপমাত্রা বেড়েছে।’
চুয়াডাঙ্গার আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘কর্কটক্রান্তি রেখা চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে অতিক্রম করায় মূলত তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে। বৃষ্টি হলে তাপমাত্রা কমবে।’
এই জেলায় এত বেশি গরম কেন অনুভূত হয় জানতে চাইলে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউআরপি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা সারোয়ার বলেন, ‘পদ্মা নদী এলাকায় তাপমাত্রা বেশি থাকে। এটি জলবায়ু ও সবুজায়নের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাপপ্রবাহের কারণে গরম বেশি থাকবে। আবার উল্টো সময়ে তাপমাত্রা কম থাকবে। এটাই নিয়ম। এর সঙ্গে অনাবৃষ্টির সম্পর্ক আছে। এমন তাপপ্রবাহের কারণে কালবৈশাখী ঝড়ের আভাস পাওয়া যায়। যা হঠাৎ ঘটবে। শঙ্কার জায়গা হলো এলাকাভেদে প্রচুর ঝড়বৃষ্টি হবে। এতে ক্ষতির মাত্রা বাড়বে।’
জলবায়ু পরিবর্তন ও মনুষ্যসৃষ্ট সংকটের কারণে এই জেলায় এত বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে বলে জানালেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘একসময় দেশের সবচেয়ে উত্তপ্ত এলাকা ছিল নাটোরের লালপুর। জলবায়ু পরিবর্তন ও মনুষ্যসৃষ্ট সংকটে সেটি এখন চুয়াডাঙ্গায় অনুভূত হচ্ছে। জলাভূমি ভরাট, অনাবৃষ্টি, নিম্নাঞ্চল বরাট ও জলাধার কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা বাড়ছে দিনদিন। ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি এসব সংকট পরিবেশকে বিরূপ করে তুলেছে।’
এদিকে, তাপমাত্রার এমন দাপটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কৃষিজমির ধানের শিষ পুড়ে যাচ্ছে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন। শ্রমিক, দিনমজুর, ভ্যান-রিকশাচালকরা গরমে কাজ করতে পারছেন না। অতিরিক্ত গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। জেলা সদরের হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ফাতেহ আকরাম বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বেশিরভাগ গরমজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠছে।’
চুয়াডাঙ্গা সদরের কুলচারা গ্রামের কৃষিশ্রমিক শফিউল আলম বলেন, ‘এত গরম সহ্য করা কঠিন। জমিতে কাজ করা যায় না। এখন ছায়ায় বসে আছি। গত কয়েকদিন এভাবেই চলছে কাজ।’
সদরের ভ্যানচালক মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এক ট্রিপ মারলে আরেক ট্রিপ মারার শক্তি থাকে না। ঘেমে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। কোনোভাবেই গরম কমছে না। এতে কম আয় হচ্ছে আমাদের।’