যে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পেশা ‘চাঁই’ তৈরি

যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম মাড়ুয়া। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পেশা চাঁই (মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ, যা বাঁশ দিয়ে বানানো) তৈরি। অনেকটা ঘূর্ণির মতো দেখতে এই চাঁইয়ে মাছ কেবল ঢুকতে পারে, বের হতে পারে না। এখন বর্ষা মৌসুম। এই মৌসুমে খাল-বিল, নদী-নালা, বাঁওড় কিংবা চাষের জমিতে চাঁই বসিয়ে মাছ ধরা হয়। চাঁইকে যশোরের মানুষজন চেরো বলে ডাকেন।

মাড়ুয়া গ্রামের আবু তাহেরের বাড়িতে দেখা গেছে, আবু তাহেরের স্ত্রী রিঞ্জিনা খাতুন (৪৮) বাঁশ কেটে ফালি করছেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে চেরো তৈরির কাজ করে আসছেন। বললেন, ‘স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও আমার ভাশুর এই কাজ করেন। এটাই আমাদের পেশা।’

রিঞ্জিনা খাতুন সংসারের সব কাজ সম্পন্ন করে অলস সময়টাকে কাজে লাগিয়ে বছরের পর বছর চেরো তৈরি করছেন। তিনি বলেন, ‘তল্লা বাঁশ ফেঁড়ে সেখান থেকে কয়েক প্রকারের শলাকা তৈরি করা হয়। যেগুলো খুঁটি, পাড়, বাইরের অংশ, ভেতরের অংশ কিংবা ওপরের অংশে ব্যবহার করা হয়। প্রত্যেকটি অংশের শলাকা ভিন্ন ভিন্ন আকৃতিতে; বিশেষ করে মোটা, চিকন ও চওড়া করে তৈরি করতে হয়। একটি চেরো তৈরি করতে শুধু বাঁশই নয়, এর সঙ্গে আরও কিছু উপকরণ লাগে। যার বেশিরভাগই প্রাকৃতিক। যেমন শলাকা বুনতে ব্যবহার করা হয় তালের চোস (তাল গাছের পাতার সংযুক্ত চওড়া অংশ, যেটি ভেজানোর পর পিটিয়ে আঁশ বের করে সুতার মতো করা হয়), মৃত খেজুর গাছের শেকড় আর কট সুতা (নাইলনের)। উচ্চতা অনুসারে চেরোর দাম নির্ধারণ করা হয়।’

অনেকটা ঘূর্ণির মতো দেখতে এই চাঁইয়ে মাছ কেবল ঢুকতে পারে, বের হতে পারে না

রিঞ্জিনা খাতুন আরও বলেন, ‘সাত বেনে (প্রায় ১৬ ইঞ্চি) এবং ৯ বেনে (১৮ ইঞ্চি) এই দুই ধরনের চেরো আমরা তৈরি করি। সাত বেনের দাম ১০০-১২০ টাকা এবং ৯ বেনের দাম ১৫০-২০০ টাকা।’

বাঁশের দামের পাশাপাশি তালের চোস, খেজুরের শেকড় ইত্যাদির দামও বেড়েছে। সে তুলনায় চেরোর দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। তবু সাংসারিক কাজের ফাঁকে বাড়িতে বসে প্রতি বর্ষা মৌসুমে কিছু টাকা বাড়তি আয় হচ্ছে বলেও জানান রিঞ্জিনা খাতুন।

চেরোতে সাধারণত টাকি, শিং, মাগুর, কই আর ছোট রুই-কাতল মাছ আটকায়। বেশি মাছ আটকালে এটি একবারই ব্যবহার করা যায়, কেননা মাছই সেগুলো ভেঙে ফেলে।

একই এলাকার বাসিন্দা হেলালউদ্দিন বলেন, ‘যখন ছয়-সাত বছর বয়স, তখন বাবার কাছ থেকে চেরো বানানোর কৌশল শিখেছি। প্রায় ২২ বছর ধরে এই কাজ করছি। বাঁশ, তাল গাছের চোস, কট সুতোর দাম বেড়েছে, সেই তুলনায় আমাদের এখন লাভ বেশি একটা হয় না। আগে কাঁচামালের দাম সস্তা ছিল, বিক্রিও ভালো হতো। বর্তমানে নদী-নালা, খাল-বিল শুকিয়ে গেছে, বৃষ্টিও নেই। সে কারণে এখন বিক্রিও কমেছে। প্রচুর বৃষ্টি হলে চেরোর চাহিদা বাড়ে।’

চেরো তৈরি করছেন এই গ্রামের বাসিন্দা হেলালউদ্দিন

ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘গত চার দিনে ৪০টি চেরো বানিয়েছি। চৌগাছা হাটে নিয়ে এগুলো বিক্রি করছি। হিসেবে দিনে ৩০০ টাকা করে মজুরি পড়ে। এই টাকা দিয়ে সংসার চালানো মুশকিল। অন্য কোনও কাজ করি না। বাজার থেকে বাঁশ আনি, বাড়ি বসে চেরো বানাই। পরের জমিতে কাজ করতে গেলে কাদামাটি ভেঙে ফিরতে হয়, আবার মজুরির টাকা দিতেও মালিকপক্ষ গড়িমসি করে।’

পাড়া থেকে চেরো সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় পাইকারিতে বিক্রি করেন মাড়ুয়া এলাকার বাসিন্দা উকিল উদ্দিন বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি না থাকলে খাল-বিল পুকুরের মাছ বের হয় না। মাছ বের না হলে চেরো বিক্রিও হয় না। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ঢল নামেনি, তাই চেরো বিক্রি বাড়েনি।’

উকিল উদ্দিন বিশ্বাস এই এলাকা থেকে চেরো সংগ্রহ করে চৌগাছা, ঝিকরগাছা ছাড়াও ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন উপজেলায় সরবরাহ করে থাকেন।

মাড়ুয়া গ্রামের বাসিন্দা হেলালউদ্দিন চেরো তৈরি করছেন

মাড়ুয়া গ্রামের এসব চেরো তৈরিতে সহায়তা করে আসছে শিশু নিলয় ফাউন্ডেশন নামে একটি সংস্থা। সংস্থার মৎস্য কর্মকর্তা জামিল হোসাইন বলেন, ‘চৌগাছার মাড়ুয়া এবং কালীগঞ্জের ধোপাদিতে মাছ ধরার যে যন্ত্রপাতি, তা তৈরিতে নানা উপকরণ সরবরাহসহ তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি আমরা। মাড়ুয়াতে চেরো তৈরি ঐতিহ্য। কিন্তু এটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। আমরা ঐতিহ্য সংরক্ষণে গ্রামবাসীকে সহায়তা করছি। প্রায় ৭০টি পরিবারকে সহায়তা দিয়েছি, যাদের মাধ্যমে অন্তত ৩০০ নারী-পুরুষ প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা তাদের চেরো তৈরি, মানসম্মত করার প্রশিক্ষণ এবং সেগুলো বাজারজাতকরণ বিশেষ করে পণ্যের বিক্রিতে সহায়তা করছি।’

চৌগাছা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হরিদাস কুমার দেবনাথ বলেন, ‘উপজেলায় তিনটি নদী, সাতটি বাঁওড়, ২৫টি খাল, বর্ষায় ১৯৮০ হেক্টর প্লাবন ভূমি, সরকারি-বেসরকারি মিলে সাতটি বিল, ছয় হাজার ৫৫২টি পুকুর  রয়েছে। এতে মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ১৮ হাজার ৭৫৮ মেট্রিক টন। উপজেলায় নিবন্ধিত মৎসজীবী রয়েছেন এক হাজার ৪৮৮ জন। উপজেলায় মাছের চাহিদা পাঁচ হাজার ৩৭ মেট্রিক টন।’