বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ কখনোই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতো না। তাদের খোলসটাই কেবল ছিল গণতান্ত্রিক। সেটি তারা প্রমাণ করেছে মুক্তিযুদ্ধের সময়, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে এবং তাদের গত ১৬ বছরের শাসনকালে।’
শুক্রবার (২২ নভেম্বর) রাতে যশোর জিলা পরিষদ মিলনায়তনে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন ও আজকের প্রেক্ষিত: নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান একদিনের বিষয় নয়। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সুপরিকল্পিত ও সুচিন্তিতভাবে ১৯৭২-৭৫ সালে তাদের যে ভাবনা ছিল একদলীয় শাসনব্যবস্থা, সেই লক্ষ্যে কাজ করে গেছে। সেই সময় বাকশাল গঠন করলেও এই সময়কালে তারা ভিন্ন আঙ্গিকে আবারও একদলীয় শাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।’
সংস্কারের বিষয় উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরাই সবার আগে সংস্কার চেয়েছি। কিন্তু সেই সংস্কার সাসটেইনেবল হতে হবে। সেজন্য জনগণের সমর্থন আগে দরকার। একটা কমিটি করে সংবিধান সংস্কার হবে না। ওটা করতে গেলে সাংবিধানিক কিংবা সংসদের প্রতিনিধি লাগবে। সেটার জন্য ধৈর্য ধরতে হবে। সবচেয়ে প্রধান যে জিনিসটা দরকার, সেটি হলো নির্বাচন। একদিকে যেমন মানুষ পরিবর্তনের জন্য জীবন দিয়েছে, তেমনি নির্বাচনের জন্যও মানুষ প্রাণ দিয়েছে। হঠাৎ করেই কোনোকিছু পরিবর্তন করে ফেললে হবে না। সেটা কতটা টেকসই সেই চিন্তাও করতে হবে। তার জন্য গণতান্ত্রিক পথে যেতে হবে। তারা যদি বলতো, বিপ্লবী সরকার গঠন করেছি, তাহলে বিপ্লবী সরকার করতো। আমাদের কিছু বলার ছিল না। এটা (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) বিপ্লবী সরকার নয়, সাংবিধানিক সরকার। আপিল বিভাগ থেকে এর বৈধতা নেওয়া হয়েছে। ওটাকে ধরে রেখেই আমাদের এগোতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে বড় ক্রান্তিকাল। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা ফ্যাসিস্টকে বিদায় করেছি। আমাদের ঐক্য ধরে রাখতে হবে। আমাদের সঠিকভাবে রূপান্তর ঘটাতে হবে। যে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, চেতনাকে ফিরে এনে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, মানবিক মূল্যবোধ, কল্যাণকর দেশ গড়তে পারি। আমাদের সামনে এটাই লক্ষ্য।’
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা যাবে না। একাত্তরকে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দিয়ে আমরা এই ভূখণ্ড পেয়েছি। যে গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করেছি, দেশ স্বাধীন করেছি। ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম দিয়েছে। সেই গণতন্ত্র আওয়ামী লীগ ধংস করেছে। অনেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়ে চিন্তা করতে বলছে। আমরা এটাকে বাদ দিয়ে চিন্তা করতে পারি না। একই সঙ্গে ৭ নভেম্বরকে আমরা ভুলতে পারি না।’
হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে প্রধান অতিথি বলেন, ‘দেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হয়েছে; কিন্তু তারচেয়ে বেশি প্রচারণা চালানো হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারতীয় মিডিয়াগুলো থেকে এই অপপ্রচার চালানো হয়েছে।’ এটি একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশে দখল ও চাঁদাবাজির বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একেবারে যে হচ্ছে না- তা বলবো না। সে কারণে ইতোমধ্যে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় সাড়ে সাতশ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক নার্গিস বেগমের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায়চৌধুরী, বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, মানবাধিকার সংগঠক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, ক্রীড়া সংগঠক চিন্ময় সাহা, যশোর আদালতের জিপি শেখ আবদুল মোহায়মেন, কওমি মাদ্রাসা খুলনা বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আবদুল মান্নান, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের সভাপতি আকরামুজ্জামান, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি শ্যামল দাস, চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধি ডা. এসএম রবিউল ইসলাম, যশোর জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইবাদত হোসেন খান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাড. সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু। উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইঞ্জিনিয়ার টি এস আইয়ুব, সাবিরা নাজমুল মুন্নী, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মনিরুল হুদা প্রমুখ।
জেলা বিএনপি আয়োজিত এই নাগরিক ভাবনা অনুষ্ঠানে যশোরের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ তাদের মতামত তুলে ধরেন।