খুলনায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এইচআইভি পজিটিভ রোগীর সংখ্যা। গত এক বছরে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন ১০০ জন। এর মধ্যে আট জন শিশু। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। আক্রান্তদের মধ্যে সাধারণ মানুষ ৫৬ জন, সমকামী ৩৭ জন এবং রক্ত নিয়ে সাত জন আক্রান্ত হন।
সোমবার (০১ ডিসেম্বর) খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে এইচআইভি চিকিৎসার এআরটি সেন্টার সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এইচআইভি সেন্টারের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে এক হাজার ২৭৯ জনের রক্ত পরীক্ষায় ১০০ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। এর আগে ২০২৪ সালে এক হাজার ৫৪৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছিল ৮৫ জন; ওই বছর মৃত্যু হয়েছিল ২০ জনের, ২০২৩ সালে পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ছিল ৬৫; মৃত্যু হয়েছিল ১৯ জনের এবং ২০২২ সালে ৬৫ জন শনাক্ত হন; মৃত্যু হয়েছিল ২৪ জনের।
সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, জেলাভিত্তিক আন্তাক্তের মধ্যে খুলনায় ৪৯, বাগেরহাটে ১৬, নড়াইলে ১১, সাতক্ষীরায় ১১, যশোরে ছয়, গোপালগঞ্জে তিন, পিরোজপুরে দুই, কুষ্টিয়া এবং রাজবাড়ীতে একজন করে। খুলনায় আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৩৫ এবং নারী ১৪ জন।
যেভাবে ছাড়াচ্ছে এইডস
জেলায় এইচআইভির উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন প্রধানত পুরুষদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষ, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি, নারী যৌনকর্মী ও অনিরাপদ রক্ত গ্রহণকারী ব্যক্তি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচআইভি একটি ভাইরাসের ছোট নাম। এটি মানুষের শরীরে সংক্রমণ হলেই রোগ হয়ে যায় না। সংক্রমণ হয়ে রোগ হতে অনেক বছর সময় নেয়। ১০-১৫ কিংবা ২০ বছর পর এই রোগ হয়। এজন্য যাদের এইচআইভি আছে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে কোনও রোগ নেই। আক্রান্ত হওয়ার জন্য পুরুষদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, একই সিরিঞ্জে মাদক গ্রহণ, রোগের তথ্য গোপন, তরুণদের সচেতনতার অভাব ও অনিয়ন্ত্রিত যৌন সম্পর্ককে দায়ী করছেন চিকিৎসকরা। এ ছাড়া ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা নিষিদ্ধ নেশাজাতীয় ইনজেকশনের মাধ্যমে এই রোগ ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মৃতদের মধ্যে ১৭ জন পুরুষ, ছয় জন নারী
এআরটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, এইডসের কারণে মৃত্যুর ঘটনা সম্প্রতি খুলনায় বেড়েছে। গত এক বছরে মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের, যার মধ্যে পুরুষ ১৭ জন বাকিরা নারী। মৃতদের জেলা হিসেবে, যশোরে সাত, খুলনায় চার, নড়াইলে চার, সাতক্ষীরায় চার, বাগেরহাটে দুই, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর একজন করে।
আক্রান্তদের জন্য দায়ী বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে অনিরাপদ রক্ত বিক্রি
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকে পরীক্ষা করাতে ভয় কিংবা সংকোচ বোধ করেন। ফলে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে অনিরাপদ রক্ত বিক্রি এবং ব্লাড স্ক্রিনিং যথাযথভাবে না হওয়ায় ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া ছাড়া এটি রোধ করা যাবে না।
কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনধারা মেনে একপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মাদক ও অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক ত্যাগ এবং অনিরাপদ রক্ত এড়িয়ে চলার মধ্য দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। নিরাপদ রক্ত ব্যবহার ও সচেতনতা অবশ্যই মেনে চলা জরুরি। সচেতনতা ছাড়া এইডস প্রতিরোধ সম্ভব নয়।’
খুলনায় মোট রোগী কত
খুলনায় এইচআইভি পরীক্ষা ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু হয়। জাতীয় নজরদারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে ওই বছর থেকে দেশব্যাপী, যার মধ্যে খুলনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, এইচআইভি পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। এরপর থেকে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। যা প্রতি বছরই বাড়ছে।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্টেটর দিবেশ ওঝা বলেন, ‘প্রতি বছর এইচআইভি আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে আক্রান্ত রোগী ৮৮৯ জন। যার মধ্যে পুরুষ ৫৪২, নারী ৩৩৮ এবং হিজড়া ১৭ জন। আক্রান্তরা এআরটি সেন্টার থেকে নিয়মিত বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন। বর্তমানে নিয়মিত ওষুধ সেবন করছেন ৫৫০ জন। বাকি রোগীদের মধ্যে কেউ মারা গেছেন, আবার কেউ অন্য সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
সচেতনতার বিকল্প নেই
খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। সচেতনতাই পারে এইচআইভির ঝুঁকি কমাতে। আজ বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে খুলনা সিভিল সার্জন অফিস চত্বর থেকে র্যালি বের করা হয়েছে। এইডস প্রতিরোধে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা করা হয়েছে।’
বর্তমানে দেশে এইডস আক্রান্ত রোগী ১৭ হাজার ৪৮০ জন
বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে প্রথম এইচআইভি (এইডসের ভাইরাস) পজিটিভ ব্যক্তি শনাক্ত হয়। এরপর প্রতি বছর আক্রান্ত ব্যক্তি পাওয়া যায়। দু-এক বছর এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা কমে গেলেও বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাই ছিল বেশি। বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে চলতি বছর এক হাজার ৮৯১ জন আক্রান্ত হন। একই সময়ে এইডসে মারা গেছেন ২১৯ জন। আজ বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল অডিটরিয়ামে আয়োজিত সভায় এ তথ্য জানানো হয়।