বিয়ের সাজের স্বস্তির চোখের জলই রূপ নিলো বিষাদের কান্নায়

পরনে লাল শাড়ি, হাতে মেহেদি। লাল শাড়িতেই বিয়ে হয়েছে রাতে। পরদিন সেই শাড়িতেই হলো বিদায়। এক রাত না পেরুতেই বিয়ের আনন্দ পরিণত হয়েছে বিষাদে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেছে নব দম্পতিসহ ১৪টি প্রাণ। স্বজনদের কান্নায় ভারী হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং মোংলা ও কয়রার আকাশ-বাতাস।

একদিন আগেও যে বাড়িতে বাজছিলো বিয়ের সানাই, হাসি-আনন্দে মুখর ছিল আঙিনা, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই বাড়িতেই এখন বুকফাটা কান্না। আনন্দের আলো নিভে গিয়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। বিয়ের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেওয়ায় নিহতদের বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। এ ঘটনায় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

জানা গেছে, গত ১১ মার্চ রাতে সাতক্ষীরার কয়রার মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর সঙ্গে বিয়ে হয় বাগেরহাটের মোংলার যুবক সাব্বিরের। সারাদিনের আয়োজন, আত্মীয়-স্বজনের ভিড়, হাসি-আনন্দ আর নতুন সংসারের স্বপ্নে ভরে উঠেছিলো পুরো বাড়ি। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বরপক্ষের সদস্যরা রাতটিও কাটান কনের বাড়িতেই। রাতভর চলে গল্প, আড্ডা, হাসি আর ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা। কেউ জানতো না, এ আনন্দের রাতের পরই অপেক্ষা করছে এমন নির্মম পরিণতি।

স্থানীয় ও হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছোট ছেলের বিয়ের জন্য বুধবার কয়রায় যান মোংলা পোর্ট পৌরভার ৮ নাম্বার ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক। বুধবার রাতে বিয়ের পর সেখানেই অবস্থান করেন তারা। বৃহস্পতিবার মাইক্রোবাসযোগে নববধূকে মোংলায় নেওয়া হচ্ছিলো। এদিন বিকালে মোংলা-খুলনা মহাসড়কের বেলাই ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন নিহত হয়।

নৌবাহিনীর দাবি, মাইক্রোবাসটি মহাসড়কের রং সাইডে ছিল বলেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে, স্থানীয়রা জানান, দ্রুতগতিতে চলাচলের জন্যই এ দুর্ঘটনা। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। আহতদের উদ্ধার করে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

কাটাখালী হাইওয়ে থানার এসআই কে এম হাসানুজ্জামান বলেন, “নৌবাহিনীর যাত্রীবাহী বাসটি খুলনার দিকে যাচ্ছিলো। আর যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি ছিলো মোংলা অভিমুখে। বেলাইব্রিজ এলাকায় দু’টি যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।”

মিতু

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন, বর আহাদুর রহমান সাব্বির (৩০), নববধূ মারজিয়া আক্তার মিতু (২৫), মিতুর নানী আনোয়ারা (৭০), দাদি রাশিদা বেগম (৭৫), বোন লামিয়া (১২), বরের বাবা আব্দুর রাজ্জাক (৭০), মা আঞ্জুমান বেগম (৬০), বরের ভাবি পুতুল (৩৫), তার ছেলে আলিফ (১২), বরের বোন ঐশি (৩০), তারর স্বামী সামিউল, ছেলে আব্দুল্লাহ সানি (১২) ও দেড় বছরের শিশু ইরাম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈম (৪০)।

কাটাখালী হাইওয়ে থানার এসআই মো. হাসান বলেন, “নিহত সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিলো। মাইক্রোবাসে বর পরিবারের ১১ জন, কনে পরিবারের তিনজন ও ড্রাইভারসহ ১৫ জন ছিলো। নিহতদের মধ্যে বরের পরিবারের ১০ জন, কনে পরিবারের তিনজন ও ড্রাইভার রয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনের মরদেহ খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং বাকি চারজনের মরদেহ রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে।”

রামপাল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুব্রত মন্ডল জানান, ঘটনাস্থল থেকে চারটি লাশ নেওয়া হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আর খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় ১০ জনের লাশ। আর একজন গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে এসেছেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ স্থানীয় প্রশাসনের সকল কর্মকর্তারা। 

নিহত মিতুর মামা আবু তাহের বলেন, “বৃহস্পতিবার দুপুরে বরযাত্রীদের মাইক্রোবাসে ভাগ্নি শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। রামপালের কাছাকাছি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মার্জিয়া, তার বোন লামিয়া ও নানী মারা গেছেন।”

বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ওসি মো. জাফর আহমেদ বলেন, “মোংলা-খুলনা মহাসড়কে বেপরোয়াভাবে সকল গাড়ি চলাচল করে। নৌবাহিনীর কয়েকটি বাসও চলে এ সড়কে। বিষয়টি নৌবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বেশ কয়েকবার বলা হলেও এ পর্যন্ত কোনও ফল হয়নি। ফলে বৃহস্পতিবার এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটলো।”