সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে দুধ দিয়ে গোসল করে জামায়াতে ইসলামী ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন দলের এক কর্মী। কেবল জামায়াত ছেড়েছেন এমন নয়, আর কোনোদিন রাজনীতি না করার শপথ নিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টার দিকে শ্যামনগর উপজেলার নূরনগর ইউনিয়নের হরিণাগাড়ি গ্রামের দেবাশীর মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। জামায়াতের ওই কর্মীর নাম দেলোয়ার হোসেন (৩৭)। তার বাড়ি হরিণাগাড়ি গ্রামে। তিনি জানিয়েছেন, তিনি স্থানীয় ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের বায়তুল মাল সম্পাদক এবং যুব বিভাগের সেক্রেটারির দায়িত্বে ছিলেন। এলাকায় দলের একজন সক্রিয় ও নিবেদিত কর্মী হিসেবে তার পরিচিতি ছিল।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দেলোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের পক্ষে নির্বাচনের সময় মাঠে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অপকর্মের সংবাদ সামনে আসার পর পুরো এলাকায় তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি প্রমাণিত হওয়ায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও দেলোয়ার হোসেন প্রচণ্ড মানসিক কষ্টে ভোগেন। এরই প্রেক্ষিতে হরিণাগাড়ী গ্রামের দিবাসীর মোড়ে তিনি প্রকাশ্যে আনুমানিক এক মণ দুধ ঢেলে গোসল করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের সব পদ থেকে পদত্যাগের পাশাপাশি রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আরেকজন বাসিন্দা বলেন, ‘এমপি গাজী নজরুল ইসলাম যে একটি অনৈতিক কাজ এবং অপকর্মের সঙ্গে লিপ্ত হয়েছেন, এটা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বহিষ্কার করেছে দল। এই অঞ্চলের মানুষ মর্মাহত। আমরা তার এমন কাজকে ধিক্কার এবং নিন্দা জানাই। পাশাপাশি গাজী নজরুল ইসলামকে এমপি হিসেবে দেখতে চাই না। তাকে দ্রুত পদত্যাগের আহ্বান জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি জামায়াতের কর্মী। দলকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতাম, কাজ করতাম। কিন্তু দলের শীর্ষ নেতার এ ধরনের অপকর্মের ভিডিও দেখে মানুষ ছি ছি করছে। দলীয় তদন্তে প্রমাণও মিলেছে তার অশালীন কর্মকাণ্ডের। তারপর আমি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ দল আর করবো না। দুধ দিয়ে গোসল করে ঘোষণা দিয়েছি জামায়াতে ইসলামী দল আর করবো না। ভবিষ্যতে অন্য কোনও দলেও যোগ দেবো না। এটি নিশ্চিত করতেই আমি দুধ দিয়ে গোসল করে নিজেকে মুক্ত করলাম।’
নূরনগর ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘দেলোয়ার জামায়াতের কর্মী। তবে কোন পদে আছে, তা এখনই বলতে পারছি না। আমি একজন কর্মীর কাছ থেকে শুনেছি, তিনি আজ দুধ দিয়ে গোসল করে বলেছেন আর দল করবেন না।’
এদিকে, স্থানীয় অনেকেই ওই জামায়াত নেতার অনৈতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং স্থানীয় রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতা বজায় রাখার দাবি তুলেছেন।
গত সোমবার রাতে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়। পরদিন গাজী নজরুল ইসলাম নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম। গত ১৭ জুন প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতের খুলনা অঞ্চলের পরিচালক ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ইজ্জত উল্লাহর নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন কেন্দ্রে জমা দেয়। ওই প্রতিবেদন বুধবার দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে আলোচনার পর গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়।
ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সংসদ সদস্য পদ বাতিলের দাবিতে তার বিরুদ্ধে শ্যামনগরে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। আজ বেলা ১১টায় শ্যামনগর উপজেলা নির্বাচন কমিশন অফিস চত্বরে ‘শ্যামনগরের সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে মানববন্ধন হয়। এ ছাড়া উপজেলার ঈশ্বরীপুর, কাশিমাড়ী ও নূরনগর ইউনিয়নে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়েছে।