বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.)–এর মাজারের দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া ‘ধলাপাহাড়’ নামের কুমিরটিকে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে নেওয়া হয়েছে। গত ১২ আগস্ট খুলনার বয়রার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কুমিরটিকে কক্সবাজারে নেওয়া হয়। রবিবার (২৩ আগস্ট) বিষয়টি জানিয়েছেন বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল।
নির্মল কুমার পাল বলেন, ‘বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে কোনও প্রাণী দীর্ঘদিন রাখার সুযোগ নেই। এ কারণে বৃহত্তর আবাসস্থলের কথা বিবেচনা করে কুমিরটিকে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এ বিষয়ে ঢাকার বন সংরক্ষক, বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলে চিঠি পাঠানোর পর কক্সবাজারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় কুমিরটি প্রায় কোনও খাবারই খায়নি। শুরুতে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলেও খাবার না খাওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার কুমির বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয় বন বিভাগ। এতেও কোনও কাজ হয়নি।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, বন্দি অবস্থায় কুমির দীর্ঘ সময় না খেলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। জোর করে খাওয়ানোরও দরকার নেই। কেন্দ্রটির চিকিৎসক জুলকারনাইনও কুমিরটির শারীরিক পরীক্ষা করে সুস্থ অবস্থায় পান বলে জানান নির্মল। তার ভাষায়, নতুন পরিবেশে এসে কুমিরের কিছুদিন খাবার না খাওয়া স্বাভাবিক। শীতল রক্তবিশিষ্ট প্রাণী হওয়ায় কুমিরের শক্তির চাহিদা তুলনামূলক কম। শরীরে সঞ্চিত চর্বি থেকেও তারা দীর্ঘ সময় শক্তি পেতে পারে।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম বলেন, ‘কুমিরটিকে এখন বেশ ভালো মনে হচ্ছে। পার্কের দিঘিতে সপ্তাহে একদিন খাবার দেওয়া হয়। এখানে আনার পরদিনই কুমিরটি একটি জীবিত মুরগি খেয়েছে। তবে এরপর আর খাবার খেতে দেখা যায়নি।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কুমিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাত থেকে আট ফুট এবং ওজন আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি। ২০০৪ সালে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে খানজাহান আলী (রহ.)-এর দিঘিতে আনা ছয়টি কুমিরের মধ্যে এটিই বর্তমানে জীবিত থাকা শেষ কুমির।
গত ১ জুন রাতে মাজারের দিঘির মহিলা ঘাটে কুমিরের আক্রমণে মারা যায় আট বছরের শিশু ফাতেমা। পরদিন ভোরে দিঘির পানিতে শিশুটির লাশ ভেসে উঠলে তা উদ্ধার করা হয়। এর আগে একটি কুকুরকেও কুমিরটি আক্রমণ করে হত্যা করেছিল। শিশুর মৃত্যুর পর দিঘিতে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে ৩ জুন কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বয়রা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, দিঘি খননের পর খানজাহান আলী (রহ.) সেখানে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন বলে প্রচলিত আছে। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সতীশ চন্দ্র মিত্রের ইতিহাস গ্রন্থে ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ নামে দুটি কুমিরের কথা পাওয়া যায়। তবে খানজাহান আলী (রহ.)-এর আমলের কুমিরের বংশধারা ২০১৫ সালে শেষ হয়। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘ধলাপাহাড়’ নামের শতবর্ষী একটি কুমির মারা যায়। এর আগে কুমিরের সংখ্যা কমে আসায় ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব কুমিরের কয়েকটি মারা যায় এবং কয়েকটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ‘ধলাপাহাড়’ নামের মাদি কুমিরটিই দিঘিতে টিকে ছিল।