সার সংকটের আড়ালে এক জেলার কৃষকের ৩৭৫ কোটি যাচ্ছে কাদের পকেটে?

যশোরে আমন মৌসুমে সারের সংকট না থাকার পরও কৃষকদের বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ, কোথাও আরও বেশি, আবার কোথাও প্রকাশ্যে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে টিএসপি, ইউরিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সার। ফলে বাড়তি এই দামের বোঝা গিয়ে পড়ছে কৃষকের ঘাড়ে।

কৃষকদের অভিযোগ, সার কিনতে গিয়ে একদিকে যেমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুনতে হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষেত্রবিশেষে অভিযান ও জরিমানা করা হলেও সার বিক্রির অতিরিক্ত দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি তাদের।

যশোরের শেখহাটি গ্রামের কৃষক কবীর হোসেন এবার দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। তার প্রয়োজন ৩০ কেজি টিএসপি সার। সার সংগ্রহ করতে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন তিনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জামরুলতলা বাজারের একটি দোকান থেকে ২৫ কেজি টিএসপি সংগ্রহ করতে পারলেও সরকার নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ টাকা দিতে হয়েছে তাকে।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কবীর হোসেন বলেন, ‌‘প্রকাশ্যেই দ্বিগুণ দামে সার বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কার্যত কোনও ব্যবস্থা তো নেওয়া হচ্ছে না। দোকানদার আমার পরিচিত, তাই আমার কাছ থেকে দ্বিগুণের কিছু কম নিয়েছেন। কিন্তু আমি থাকতেই আরেকজনের কাছে টিএসপি সার ৫২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেন।’

তরিকুল ইসলাম নামে এক সার বিক্রেতা বলেন, ‘সার পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সারের দাম ওঠানামা করছে। আমাদের বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তাই সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রি করতে পারছি না।’

ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারনালী গ্রামের কৃষক আবদুল আলিমও একই অভিযোগ করেন। চার বিঘা আমন জমির জন্য তিনি খোলাবাজার থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি টিএসপি কিনেছেন বলে জানান।

হিসাবেই বাড়তি ৩৭৫ কোটি টাকা

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব জমির জন্য সারের চাহিদা ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৩৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ৬৮ হাজার ৯০৩ মেট্রিক টন, টিএসপি ১৭ হাজার ৫৯৮ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪৩ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন এবং এমওপি ২৫ হাজার ৫১১ মেট্রিক টন।

কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামে এই পরিমাণ সারের মোট মূল্য প্রায় ৩৭৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এর মধ্যে ইউরিয়ার মূল্য ১৮৬ কোটি ৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা, টিএসপি ৪৭ কোটি ৫১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, ডিএপি ৯০ কোটি ৭৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং এমওপি ৫১ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।

সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় দ্বিগুণ দামে এসব সার বিক্রি করা হলে কৃষকদের কাছ থেকে মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৭৫০ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় কৃষকদের অতিরিক্ত গুনতে হবে ৩৭৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা।

মাঠপর্যায়ের কয়েকজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগে কৃষকদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে আমাদেরও। কিন্তু অভিযান চালিয়েও দাম নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। কেউ গোপনে আবার কেউ প্রকাশ্যে বেশি দাম ঠিকই নিচ্ছেন।’ 

তবে দায়িত্বশীল কৃষি কর্মকর্তা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ স্বীকার করছেন না। তারা বিষয়টি এড়িয়েও গেলেও বিভিন্ন দোকান ঘুরে দ্বিগুণ ও বেশি দামে সার বিক্রির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বরাদ্দ ও মজুত আছে, তবু সংকট

হিসাব অনুযায়ী, ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চলতি মাসের বরাদ্দ থেকে যশোরে ৮ হাজার ৫৩৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ২ হাজার ৮১০ টন টিএসপি, ২ হাজার ১৪০ টন ডিএপি এবং ২ হাজার ২৩১ টন এমওপি সার উত্তোলন করা হয়েছে। একই তারিখে জেলার বিভিন্ন গুদামে মজুত ছিল ৩ হাজার ৭৩৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ১ হাজার ১৪৮ টন টিএসপি, ১ হাজার ২৯ টন ডিএপি এবং ১ হাজার ৪১৩ টন এমওপি। চার ধরনের সারের গুদামজাত মজুতের পরিমাণ মোট ৭ হাজার ৪২৫ মেট্রিক টন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যশোর কার্যালয়ের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে। বাড়তি দামে সার বিক্রির সুযোগ নেই। কেউ বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ পেলে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

তবে বর্তমানে প্রকাশ্যেই প্রায় দ্বিগুণ দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগটি মিথ্যা বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে যশোর সদরের বাহাদুরপুর বাফার গুদামের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) আক্তারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তার কার্যালয় থেকে যশোর, নড়াইল ও মাগুরায় সবচেয়ে বেশি ইউরিয়া সার সরবরাহ করা হয়। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গুদামে ১৩ হাজার ৮৪৬ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার মজুত রয়েছে।

অভিযানেও থামছে না বাড়তি দামে বিক্রি

বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগে এরই মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকটি অভিযান চালানো হয়েছে। গত ২ আগস্ট অভয়নগর উপজেলার মরিচা ও শুভরাড়া বালুরঘাট বাজারে অভিযান চালিয়ে দুই সার পরিবেশককে মোট ১০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশীষ কুমার বসু ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন।

তিনি জানান, মেসার্স মাসুদ-মামুন ট্রেডার্সের মালিক মাসুদ মোল্লা সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকা মূল্যের এক বস্তা টিএসপি ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছিলেন। এ অপরাধে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযোগে মেসার্স ভাই ভাই কৃষি স্টোরের মালিক রিয়াজ উদ্দীনকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। দুই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মোট ১০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

এদিকে ২৫ আগস্ট চৌগাছা উপজেলার কুটিপাড়া মোড় এলাকায় আলমসাধুতে করে ঝিকরগাছার দিকে নেওয়ার সময় স্থানীয় লোকজন ৩৭ বস্তা সার আটক করেন। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সার পরিবহনের ক্রয়চালান ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখতে চান। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এসি ল্যান্ডের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত সারগুলো জব্দ করেন।

সরকারি হিসাবে জেলায় সারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও মজুত থাকার পরও কৃষকের কাছে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ এবং মাঠপর্যায়ে সারের সংকট—দুইয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

কৃষকদের দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার পুরো চেইন নজরদারির আওতায় এনে নির্ধারিত দামে সার নিশ্চিত করা না গেলে আমন মৌসুমে তাদের উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে।