সংসারের অভাব ঘোচাতে নির্মাণশ্রমিকের কাজের আশায় রাশিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার রাজন হোসেন (২২)। দালালের মাধ্যমে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে রাশিয়ায় গেলেও সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, নির্মাণশ্রমিক নয়, তাকে যুদ্ধ করতে হবে। যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েও শেষ পর্যন্ত রুশ বাহিনীর হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য হন তিনি।
দেড় মাসের মাথায় ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় রাজনের। এরপর থেকে দুই পায়ের শক্তি হারিয়েছেন। অবশেষে গত ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন। রাজন হোসেন উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের আব্দুল কাদের কালুর ছেলে।
পরিবার ও রাজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশে গিয়ে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করার আশায় দালালের মাধ্যমে রাশিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করেন রাজন। চলতি বছরের ৭ মে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। একই দিন রাশিয়ার রাজধানী মস্কো বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে রাজনসহ ৩০ বাংলাদেশিকে একটি বাসে করে মস্কো থেকে ওয়ারেনবার্গে নিয়ে যাওয়া হয়।
ওয়ারেনবার্গে একটি হোটেলে তিন থেকে চার দিন রাখার পর ব্যাংক কার্ড ও সিম কার্ড দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন কাগজপত্রে তাদের স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়। পরে কাজের কথা বলে রাজনসহ অন্য বাংলাদেশিদের একটি অজ্ঞাত রুশ সেনাক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাজন হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেনাক্যাম্পে নেওয়ার পর আমরা বুঝতে পারি, আমাদের যুদ্ধে পাঠানো হবে। আমরা যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাই। রাশিয়ান চক্রের লোকজনের পা জড়িয়ে ধরেও রেহাই পাইনি। পরে আমাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর গাড়িতে তুলে একটি বাংকারে নিয়ে রাখা হয়।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় এক ঘণ্টা পর আমাদের ৩০ জন বাংলাদেশিকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেওয়া হয়। আমি ছয় জনের একটি দলে ছিলাম। পরে আমাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্র চালানোসহ যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২১ দিন প্রশিক্ষণের পর আমাদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়।’
রাজনের ভাষ্য, ‘প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি মারা যান। ওই দিন একটি ড্রোন আমার কোমরে আঘাত করে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। এরপর কোমরের নিচ থেকে আর কোনও শক্তি পাচ্ছিলাম না। আহত অবস্থায় চার দিনে প্রায় চার কিলোমিটার পথ বুকের ওপর ভর দিয়ে অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে পৌঁছাই। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১৫ দিন চিকিৎসাধীন ছিলাম সেখানে। পরে একজন চিকিৎসক আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান।’
রাজন বলেন, ‘গত ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরেছি। দেশে ফেরার জন্য আমার পরিবার রাশিয়ায় ৬২ হাজার রুবল পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আমাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।’
ধারদেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম
রাজনের বাবা আব্দুল কাদের বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য ধারদেনা করে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনকে। প্রায় তিন বছর ধরে ঘুরিয়ে অবশেষে গত মে মাসে শ্রমিকের কাজের কথা বলে আমার ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে নিয়ে গিয়ে তাকে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। যুদ্ধে আহত হয়ে আমার ছেলে এখন হাঁটতে পারে না। ছেলের চিকিৎসা করানোর মতো অর্থও আমার কাছে নেই। যারা আমার ছেলের সঙ্গে এমন প্রতারণা করেছে, তাদের শাস্তি চাই।’
রাজনের মা মাহফুজ বেগম বলেন, ‘আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। আমার সেই সুস্থ ছেলে এখন হাঁটতে পারে না। অন্যের কাছে সাহায্য চেয়ে কোনোভাবে দিন কাটছে। কীভাবে সংসার চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
রাজনের পরিবারের প্রতিবেশী ও কলেজ শিক্ষক মুসা করিম বলেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। রাজন এখন শারীরিকভাবে খুবই অসহায়। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত দালালদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’
স্থানীয় এজেন্টের অস্বীকার
রাজনকে বিদেশে পাঠানোর স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত আবু তাহের লেন্টু প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভাগনে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে পাঠানো হয়েছিল। আমি কোনও প্রতারণা করিনি। রাজনকে এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে।’
দেশে ফেরার পর রাজনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ। তিনি বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যেন দালালের খপ্পরে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাশিয়া থেকে ফিরে আসা রাজনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছে।’
যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়ে দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন রাজন। এখন তার চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পরিবারটি। পরিবারের দাবি, প্রতারণার মাধ্যমে রাজনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।