রাতে ফোনে বলেছিলেন ‘আমি ভালো আছি চিন্তা করো না’, সকালে মিললো লাশ

রাত ৯টার দিকে বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল আজমল হোসেনের। বলেছিলেন, ‘আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’ এর কয়েক ঘণ্টা পরই তার মোবাইল ফোন থেকে বাবার কাছে আসে আরেকটি কল। ওপাশ থেকে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। বলা হয়, টাকা না দিলে ছেলেকে পাওয়া যাবে না। রাতেই চুয়াডাঙ্গা থেকে খুলনার উদ্দেশে রওনা দেন বাবা কুতুব উদ্দিন। সকালে মেসে পৌঁছে জানতে পারেন, চুরির অভিযোগে আজমলকে মারধর করা হয়েছে। পরে পাঁচতলা ভবনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়েছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) হল রোডের পাশে আজমল হোসেন (২২) নামে এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে চুরির অপবাদ দিয়ে খুবির কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী তাকে বেদম মারপিট করেন। মারধরের একপর্যায়ে আজমল ভবনের পাঁচতলার ছাদ থেকে পড়ে যান। তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। আজমল স্বেচ্ছায় ছাদ থেকে লাফ দিয়েছেন, নাকি তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিহত আজমল খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি ওই ভবনের মেসেই ভাড়া থাকতেন। তার বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দর্শনায়।

শনিবার ভোরে চুয়াডাঙ্গা থেকে খুলনায় ছুটে আসেন আজমলের বাবা কুতুব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘রাত ১টার দিকে কয়েকজন ছেলে ফোন করে বলে আপনার ছেলে আমাদের জিনিস চুরি করছে, এখনই এক লাখ টাকা দিতে হবে। আমি বলি, আমি যতো দ্রুত পারি খুলনায় আসছি, এসে তোমাদের সঙ্গে কথা বলছি। রাতেই বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে ট্রেনে সকাল ৬টায় ওর মেসে পৌঁছে দেখি কেউ নেই। তখন এলাকার এক মুরুব্বী জানায়, আপনার ছেলেকে ওই রুমের লোকজন পিটিয়ে মেরে ফেলছে।’

রাতের শেষ ফোন

কুতুব উদ্দিন বলেন, তার দুই ছেলে। বড় ছেলে আজমল। এক বছর আগে পড়াশোনার জন্য বাড়ি থেকে খুলনায় আসেন তিনি। গত বছর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে বাড়ি গিয়েছিলেন। শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসেন। রাত ৯টার দিকে পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। তিনি বলেন, ‘তখন সে বলেছিল, আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।’

তবে রাত ১২টার পরে তার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে ফোন করে বলে, আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত ১ লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না, জানান কুতুব উদ্দিন। 

কুতুব উদ্দিন পাল্টা জানান, তারা গরিব মানুষ, এক লাখ টাকা কোথায় পাবেন। ফোনের বিপরীত দিক থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘আপনি কী করেন?’ তিনি বলেন, ‘আমি কৃষিকাজ করি।’ তখন ওই ছেলে আবার দ্রুত চলে আসতে বলে। কুতুব উদ্দিন জানান, তিনি ট্রেনে দ্রুত আসছেন। তখন ওই ছেলে বলে, ‘আপনি ট্রেনে আসবেন, না বাসে আসবেন, না প্লেনে আসবেন, সেটা আপনার ব্যাপার।’

কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘তারপর সকালে এসে দেখি আমার ছেলে আর বেঁচে নেই। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পেরেছে, তাই খুব খুশি হইছিলাম। যে ছেলে রাত ৯টায় কথা বললো, আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। সেই ছেলেকেই অন্য ছাত্ররা পিটিয়ে মেরে ফেললো। আমি কার কাছে বিচার দিবো, আমি কারও কাছে বিচার দিবো না। আমরা গরীব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আমরা বিচার পাবো না। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম। তিনিই বিচার করবেন।’

তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে গিয়ে তিনি ছেলের লাশ দেখেছেন। অতিরিক্ত মারধর করেই তাকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে কোর্ট-কাচারি করতে চান না এবং কারও প্রতি তার অভিযোগ নেই বলেও জানান। ছেলের লাশ নিয়ে বাড়ি চলে যেতে চান তিনি।

মেসে গিয়ে যা দেখা গেলো

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ছাত্র হলের পাশেই আবাসিক এলাকা। হলে যারা আসন পান না, তাদের বেশিরভাগই ওই এলাকায় ভাড়া থাকেন। খুবির খানজাহান আলী হল গেটের বিপরীতে আকিবের পাঁচতলা ভবনটি মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আজমল ওই ভবনের চতুর্থ তলায় খুবির সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে থাকতেন।

শনিবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের বিপরীতে ইসলাম নগর রোডের চারতলা ভবনের ওই মেসে গিয়ে দেখা যায়, ৮টি রুমের ৭টি কক্ষই তালাবদ্ধ। এর মধ্যে ডি-৮ রুমে থাকতেন আজমল হোসেন।

ডি-১ কক্ষে থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লাবিব বিশ্বাস রাসেল জানান, চুরির অভিযোগে মেহেদীসহ কয়েকজন আজমলকে ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মারধর করা হয়। তবে তিনি কীভাবে মারা যান, তা তিনি পরিষ্কার করে বলতে পারেননি।

ছাদে গিয়ে দেখা যায়, ছাদের একপাশে অনেক মানুষের পায়ের পাড়ায় ধুলাবালি ও ছ্যাদলা সরে যাওয়ার চিহ্ন রয়েছে।

মেসের পেছনের ভবনের একজন নারী বাসিন্দা বলেন, শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে খুব জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। পরে দরজা খুলে বাইরে এসে দেখেন, বাড়ির সামনে গলির মধ্যে একটি ছেলে পড়ে রয়েছে। পরে ছাত্ররা অ্যাম্বুলেন্স এনে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

শরীরে আঘাতের চিহ্ন

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আজমলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার মাথার চুলও এক পাশ দিয়ে কাটা ছিল এবং পা ভেঙে গিয়েছিল। কয়েকজন ছাত্র তাকে হাসপাতালে দিয়ে দ্রুত চলে যান। ভর্তির ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই তিনি মারা যান।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক জানান, নিহত আজমল হোসেনের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার পা দুটিও ছিল ভাঙা।

খবর পেয়ে নগরীর হরিণটানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে। এ সময় ওসি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘গত রাতেই আমরা শুনেছি আকিবের পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ তলায় চুরির অভিযোগে ঝামেলা হয়েছে। সকালে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, আজমলকে চুরির অভিযোগে ধরে নিয়ে মারপিট করে। পরে সে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে অসুস্থ হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর সে মারা যায়।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি।’

হরিণটানা থানার ওসি (তদন্ত) মো. মুরাদ হোসেন মিলন বলেন, ‘ঘটনাটির আমরা তদন্ত করছি। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

তবে ১ লাখ টাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নিহতের বাবা এরকম কথা তাদের বলেছেন। এর সত্যতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে ভিকটিমের চুল, কয়েকটি কাঠ ও কয়েকজনের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। মরদেহ খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ দেওয়া হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে দুপুরের পর ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এরপর মরদেহ নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের ঘটনায় আমাদের কিছু করার নেই। তবে আমরা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের সহায়তা করছি।’

এ ঘটনায় নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ শোক জানিয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।