ছেলে হত্যার আসামিরা জামিনে এসে বাবাকে মেরে ফেললো, আর মামলা করতে চাই না

দেড় মাসের ব্যবধানে একই পরিবারের বাবা ও ছেলে খুন। একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই স্বামীকেও হারালেন নাসিমা বেগম। এখন আতঙ্কে দিন কাটছে তার পরিবারের সদস্যদের। এমনকি স্বামী হত্যার ঘটনায় মামলা করতেও রাজি নন তিনি। তার ভাষ্য, ‘ছেলের হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে তার বাবাকে হত্যা করেছে। আর ঝামেলায় যেতে চাই না। মামলাও করতে চাই না।’

গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর দেড় মাস আগে গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় একই গ্রামের শহীদের মোড়ে তার ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা।

আক্তার ঢালী হত্যার পর তার পাঁচ জন স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ধারণা, জয় ঢালী হত্যার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র রয়েছে। স্বজনদের দাবি, খুলনায় ‘বি কোম্পানি’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর লোকজন আক্তার ঢালী হত্যায় জড়িত থাকতে পারে। তবে নতুন করে কোনও ঝামেলায় জড়াতে চান না তারা। এ কারণে কারও বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতেও নারাজ পরিবারের সদস্যরা।

আক্তার ঢালীর ভাতিজা লিটু ঢালী বলেন, ‘আমরা এবার আর মামলা করতে চাই না। ভাইয়ের (জয় ঢালী) হত্যা মামলায় আসামি ধরা পড়ে আবার কয়েক দিনের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসে। আমরা আর ঝামেলায় যেতে চাই না। যা পারে এবার পুলিশ করবে, আমরা কোনও মামলা করবো না। তখন আবার বিপদ আসবে।’

ছেলে গেলো, এবার ওর বাবাও গেলো

আক্তার ঢালীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী নাসিমা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, ‘আমি কী করবো, কী করার আছে আমার। আল্লাহ আমারে আর কী কী সহ্য করার জন্য রাখছে। আল্লাহ আমারে কী দৃশ্য দেখালো। এক-দুই মিনিটের মধ্যে সব শেষ। ছেলে গেলো, এবার ওর বাবা গেলো। আমরা এখন আর কোনও মামলা করতে চাই না। মামলা করে আর কী হবে।’

কিছুক্ষণ পর কয়েকজন প্রতিবেশী ও স্বজন তাকে ঘর থেকে উঠানে এনে একটি চেয়ারে বসান। উঠানে তখন অনেক মানুষ। তবে তাদের অধিকাংশই নারী। সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে তারা হঠাৎ নীরব হয়ে যান। একে অপরের কানে ফিসফিস করে কথা বলতে থাকেন।

পরে নাসিমা বেগমের এক পুত্রবধূ বলেন, ‘আসলে দেখেন, আমাদের কিছু বলার নেই। কয়েক দিনের মধ্যে দুটো মার্ডার। বাচ্চারাও রাতে ভয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠে। সবার মধ্যে আতঙ্ক। কখন কী হয়, কে জানে।’

এর মধ্যে এক বয়স্ক প্রতিবেশী পুরুষ বাড়ির উঠানে আসেন। তিনি আক্তার ঢালী হত্যার সময়ের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘তখন মাগরিবের নামাজ পড়ে কেউ বের হয়েছে, কেউ হয়নি। নামাজ শেষে আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলাম। এমন সময় দেখি, চার-পাঁচটা মোটরসাইকেল, প্রতিটায় দু-তিনজন করে মানুষ। কারও হেলমেট পরা, কারও হেলমেট নেই। একটু পরেই গুলির শব্দ শুনতে পাই। এরপর চিৎকার-চেঁচামেচি। আসলে এখন যা হচ্ছে, এসব মানা যায় না।’

কিছুটা ধাতস্থ হয়ে নাসিমা বেগম জানান, তার স্বামী সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। তিনি সেনের বাজার বাসস্ট্যান্ডে কাজ করতেন। বেলা আড়াইটার দিকে বাড়িতে ফিরে আসেন। প্রতিদিন বিকালের মতো গতকালও বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে রাখা কাঠের বেঞ্চে বসেছিলেন।

নাসিমা জানান, অন্য দিন তার স্বামীর সঙ্গে নিহত ছেলে জয়ের আট মাস বয়সী মেয়েসহ প্রতিবেশীরা থাকতো। কিন্তু গতকাল সেখানে কেউ ছিল না। গতকাল বেঞ্চের জায়গাটিতে মশার উৎপাত ছিল। তাকে ডেকে সেখানে মশার কয়েল জ্বালিয়ে দিতে বলেন আক্তার ঢালী। এ জন্য তিনি বাড়ির ভেতরে ঢুকেছিলেন। এর মধ্যেই গুলির ঘটনা ঘটে। নাসিমা বলেন, ‘তারা (দুর্বৃত্তরা) গুলি করেই চলে যায়নি, একটু সময় ছিল। এ সময় বাড়ির দিকেও গুলি ছোড়ে।’

জয়ের মামলা নিয়ে চাপ আসছে

ছেলে জয় ঢালী হত্যার মামলা নিয়ে আক্তার ঢালী চাপে ছিলেন বলে জানান নাসিমা বেগম। তিনি বলেন, ‘উনি (আক্তার ঢালী) মাঝে মাঝে আমাকে বলতেন, “জয়ের মামলা নিয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছি, চাপ আসছে। কখন কী হয়, ভয়ে থাকি।” আমি বলতাম, ছেলে তো আর ফিরে আসবে না, আমরা না হয় সব বাদ দিই।’

স্বজনেরা জানান, নাসিমা বেগমের প্রথম স্বামী সোবহান ঢালীকেও ৩০-৩২ বছর আগে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর সোবহান ঢালীর চাচাতো ভাই আক্তার ঢালীর সঙ্গে নাসিমার বিয়ে হয়।

কথাগুলো বলতে বলতে আবারও যেন ভয় চেপে বসে নাসিমার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘আমরা কিচ্ছু জানি না, কারা মেরেছে। আমি কিছু বলবো না। মাসখানেক আগে ছেলেটা চলে গেলো। এবার ওর বাবাও গেলো। তোমরাও যারা আছো, তারা এখন কিছুতে কারও নামে কিছু বলবা না। না জানি কী বিপদ হবে।’

শ্বশুর হত্যার বিষয়ে জয়ের স্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাড়ির ভেতরে ছিলাম। শব্দ শুনে বাইরে গিয়ে দেখি, বাবা বেঞ্চের পাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উপুড় হয়ে পড়ে আছেন।’

১০০ গজের মধ্যে বাবা-ছেলের বাড়ি

আক্তার ঢালীকে যেখানে গুলি করে হত্যা করা হয়, সেখান থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে তার ছেলে জয় ঢালীর বাড়ি। গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে জয়কে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।

ওই ঘটনায় নিহত জয়ের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় গ্রেফতার আসামিরা পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন।

খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, জয় ঢালী হত্যা মামলার আসামি, জামিনে থাকা ব্যক্তিরা এবং জামিনের পর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক তদন্তে কারা এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে এবং কতজন ছিল, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান শুরু করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আগের হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে বলে আমরা মনে করছি। তবে এর সঙ্গে আরও কোনও বিষয় আছে কি না, সেটাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বি কোম্পানির সদস্যরা জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এখনও কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

হুমকি পেয়ে জিডি করেছিলেন আক্তার

ছেলে হত্যার মামলা নিয়ে চাপের মধ্যে ছিলেন আক্তার ঢালী। মামলা তুলে নিতে তাকে বলা হয়েছিল এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। এসব ঘটনার পর গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তিনি।

গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় করা জিডিতে আক্তার ঢালী উল্লেখ করেছেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে সেনরেবাজার এলাকায় মামলার আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল্যা ও রোপা মোল্যা আমাকে ডেকে নিয়ে যান। তখন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেন তারা। এমনকি জীবনে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এ অবস্থায় আমি ঘটনাস্থল ত্যাগ করে চলে আসি।’ 

জিডিতে আক্তার ঢালী আরও লিখেছেন, ‘এর আগে একই আসামিরা আমার ছেলে জয় ঢালীকে দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। ওই মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলাকায় এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমিসহ আমার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জানমালের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিতাছে। আসামিদের এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমি ও আমার পরিবারবর্গ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি বিধায় আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ আমার জীবনের নিরাপত্তার জন্য জিডি করছি।’