সদ্য তোলা একতলা বাড়ির বারান্দার পাশেই ছাদে উঠবার লোহার সিঁড়ি। সেই সিঁড়িতে কয়েকজন শিশু খেলছে। নিচে অর্ধবয়স্ক নারীর হাতে একটি স্মার্টফোন। সেই মহিলাকে ঘিরে রয়েছে আরও গোটা চারেক বিভিন্ন বয়সী নারী। সবার নজর মোবাইলে। শোকাতুর চোখে সবাই যে ছবিটি দেখছিলেন; সেটি জান্নাতুল তাজমিনের। ধান ক্ষেতে বীভৎস হত্যাকাণ্ডের সেই ছবিটি দেখে কেউ কেউ আঁতকে উঠছিলেন; কেউ বা হলেন স্তব্ধ।
কুমিল্লায় ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া জান্নাতুল তাজমিন (১৪) গ্রামের বাড়িতে শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকালে গেলে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
তাজমিনের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ায়। তিনি ওই এলাকার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারসহ কুমিল্লা শহরে রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করতো। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়াতনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল তাজমিন। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) লালমাই উপজেলার জগতপুর চরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলার পর পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে তাজমিনের বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয়। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায়। বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে রওনা দেয় সে। রাতে মেয়েকে একাধিকবার ফোন করলেও কল রিসিভ হয়নি। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে তার মেয়ে মোবাইল ফোনে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠায়। মেসেজে তাকে গিয়ে নিয়ে আসতে বলে। পরের দিন সকালে সেই লাইভ লোকেশনে মেয়ের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পায়। একমাত্র সন্তানকে এভাবে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তাজমিনের বাবা মাসহ স্বজনরা। পরিবারের কাছের সদস্য ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলছেন না তারা।
এদিকে, শনিবার সকালে আটক অটোরিকশাচালক সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেছে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পিতা আব্দুল আলীম ও মা কেয়া খাতুন। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন আর মা কেয়া খাতুন বলে উঠছেন, ‘আগে জানলে কোথাও পাঠাতাম না আমার পাখিটারে। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো? জানোয়ারটা আমার মেয়ের উপর কি যে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে, আল্লাহ। কত কষ্ট পেয়েছে আমার পাখিটা। বাঁচার জন্য ধান ক্ষেতে ছোটাছুটি করেছে। তার পরেও বাঁচতে দিলো না জানোয়ারটা...। যারা আমার পাখিটার ওপর এমন নির্যাতন করেছে তাদের বিচার আল্লাহর কাছে দিলাম।’
শোকে পাথর হওয়া বাবা আব্দুল আলীমও কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। মসজিদের পাশে কবর দেওয়া মেয়ে তাজমিনের কবর জিয়ারত করে বাড়িতেই থাকছেন।
তিনিও জানতেন না মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করার ঘটনা। দুপুরের দিকে গণমাধ্যমে ধর্ষণের পরে শ্বাসরোধে হত্যা ঘটনা জানতে পেরে বাকরুদ্ধ স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন।
তাজমিনের বাবার বন্ধু ও স্থানীয় শিক্ষক শিমুল হোসেন বলেন, ‘তাজমিনের বাবা স্বাভাবিক হতে পারেনি। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে পাগল প্রায়। তারা কাউকে ওভাবে সন্দেহ করছে না। কোন বান্ধবীর বাড়িতে গিয়েছিল সেটাও তাজমিন জানায়নি।’
তাজমিনের বাবার উদ্ধৃতি দিয়ে শিমুল বলেন, ‘মেয়ে কক্সবাজার যাবে সেটা জানতো। যাওয়ার সময় বলেছিল বান্ধবীর বাসায় যাবে। সেখান থেকে বান্ধবীর সঙ্গে যাবে। কিন্তু এভাবে নিরাপত্তাহীন হবে সেটা জানলে তার বাবা নিশ্চয়ই মেয়েকে পাঠাতো না। কোন বান্ধবীর সঙ্গে ছিল; সেটাও জানতে পারেনি এখনও।’
স্থানীয়রা জানান, তাজমিনের আর কোন ভাইবোন নেই। সে খুব মেধাবী ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে বাবা মায়ের সঙ্গে গ্রামে বেড়াতে আসতো। এই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, এই হত্যার ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। অটোরিকশাচালক সুমনই তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি জানান, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। চালক সুমন মিয়া ৫০০ টাকা ভাড়া চাইলে ৩০০ টাকায় যাওয়ার চুক্তি হয়। যাত্রাপথে একটি দোকান থেকে ১০০ টাকা দিয়ে চালককে রুটি ও কলা কিনে আনতে দেয় ওই কিশোরী। এরপর তারা গন্তব্যের দিকে রওনা হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর শর্টকাটে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুর রোডের দিকে চলে যায় চালক সুমন।
পুলিশ কর্মকর্তা জানান, পরে বিজরা বাজার হয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে হঠাৎ অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয় সে। এতে তাজমিন ভয় পেয়ে যায়। জায়গাটি চিনতে না পেরে সে চালককে প্রশ্ন করলে সে জানায়, এটি রেসকোর্স নয়। বিপদ বুঝতে পেরে তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় চালক সুমন তাকে আটকাতে গেলে তাজমিন চিৎকার শুরু করে। তখন সুমন গামছা দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয় এবং তাজমীন দুর্বল হয়ে পড়ে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সুমন স্বীকার করেছে, এ সময় সে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে। পরে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে উপুড় করে মাথায় পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তারপর তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন ছিনিয়ে নেয় সুমন এবং ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। পরে অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলেই ফেলে রেখে কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে সে। এরপর অন্য একটি ভাড়ায়চালিত অটোরিকশা করে বাখরাবাদ এলাকায় চলে যায়। সেখানে একটি পুকুর পাড়ের জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায় সুমন। গ্রেফতারের পর সুমনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদ এলাকার সেই জঙ্গল থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন ও ধানক্ষেত থেকে ভ্যানিটি ব্যাগটি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
তিনি জানান, তাজমিন গত ৪ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ থাকলেও তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনও জিডি বা অভিযোগ করা হয়নি। চার দিন সে কোথায় বা কার সঙ্গে ছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আসামি সুমনের স্বীকারোক্তি থাকলেও ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে এবং উদ্ধার হওয়া আইফোনটির বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হবে।