শামীমকে পিটিয়ে হত্যা: আদালতে জবানবন্দিতে যা বললেন আমিনী

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তৃতীয় আদালতের বিচারক নুসরত জাহানের খাস কামরায় তিনি জবানবন্দি দেওয়া শুরু করেন। রাত সাড়ে ৯টার দিকে জবানবন্দি শেষ হয়। গ্রেফতারকৃত ফজলুল হক দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দেবহাটা থানার উপপরিদর্শক আল আমিন বলেন, ‘রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় আমিনীকে আদালতের বিচারক নুসরত জাহানের খাস কামরায় হাজির করা হয়। সেখানে নিজেকে শামীম হত্যা মামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।’

আদালতের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, ফজলুল হক আমিনী তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, শামীম নাস্তিক ছিল। তাকে মারার কোনও উদ্দেশ্য তার ছিল না। অ্যাক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে। আপাতত আইনের দৃষ্টিতে তিনি অপরাধী হলেও আল্লাহর দৃষ্টিতে তিনি কি, সেটা আল্লাহ ভালো জানেন। এ সময় তিনি হত্যাকাণ্ডে কারা কারা জড়িত তাদের নাম প্রকাশ করেন। 

সাতক্ষীরা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক নাজমুল হক বলেন, ‘১৬৪ ধারায় জবানবন্দি শেষে ফজলুল হক আমিনীকে রবিবার রাত ৯টার পর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।’

এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। দেবহাটা সার্কেল, কালীগঞ্জ থানা, দেবহাটা থানা ও এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন)-৬-এর সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে আমিনীকে গ্রেফতার করেন। রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় তাকে। সন্ধ্যায় তাকে আদালতে পাঠায় পুলিশ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শনিবার রাত ১১টার দিকে আমিনীকে তার চাচাতো ভাই কালীগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের বসির আহমেদের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়।

বসির আহমেদ জানান, আমিনী তার চাচাতো ভাই। তার জন্ম ফরিদপুর গ্রামে। ২৮ বছর আগে তার চাচা ক্বারী রুহুল আমিন সপরিবারে দেবহাটার দক্ষিণ পারুলিয়ায় বসবাস শুরু করেন। ফজলুল হক ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। শামীমকে হত্যার পর তার বাড়িতে চলে আসেন। শনিবার রাত ১০টার দিকে আদালতে আত্মসমর্পণের ব্যাপারে তার সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি স্থানীয় বিষ্ণুপুর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলতে বলেন। একপর্যায়ে বাথরুম থেকে ফেরার পর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন। এরই মধ্যে রাত সাড়ে ১০টার দিকে এসআরবি তার বাড়িতে আসে। জিজ্ঞাসা করতেই তিনি আমিনীর অবস্থান নিশ্চিত করেন। রাত ১১টার দিকে এসআরবি তাকে নিয়ে যায়।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, ‘ফজলুল হক আমিনী হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।’

গত মঙ্গলবার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। এতে আমিনীকে (৪৫) প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। 

গত শুক্রবার ভোরে পুলিশ এজাহারভুক্ত ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। ওসি জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে।

নিহতের পরিবার জানায়, শামীম দীর্ঘদিন মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার তার ও স্ত্রীর বাগবিতণ্ডার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর তার বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয় এবং স্থানীয় একটি বাজারে তাকে মারধর করা হয়। পরে তিনি বিষপান করেন বলে পরিবার জানিয়েছে। স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মো. সবুরের চেম্বারে চিকিৎসা চলাকালে পরদিন শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে তাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করেন। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়।

দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তির পর শতাধিক লোক ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে আবার মারধর করেন। আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মীরা তাদের থামাতে ব্যর্থ হন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। হাসপাতালের কয়েকটি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব ফুটেজ দেখা সম্ভব হয়নি। পুলিশ আমাদের কাছে এখনও ফুটেজ চায়নি। চাইলে আমরা দিতে পারবো।’