শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে খুলনায় এবার ৮১৮টি মন্দিরে পূজা-অর্চনার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নের খরসংগ কালার বটতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরে তৈরি করা হয়েছে ২০১টি প্রতিমা। একই এলাকার আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে খরসংগ মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে তৈরি হয়েছে আরও ১৫২টি প্রতিমা। কাছাকাছি দুটি মন্দিরে বিপুলসংখ্যক প্রতিমা নির্মাণকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। প্রতিমা দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
ডুমুরিয়ার রুদাঘরা ইউনিয়নের খরসংগ গ্রামের শতবর্ষী দুর্গামন্দিরে ২০১টি প্রতিমা গড়া হয়েছে। অন্যদিকে, মন্দিরটির পূর্ব দিকে মিকশিমিল বাজারের পাশে সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে ১৫২টি প্রতিমা নিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৫২তম দুর্গোৎসব।
খরসংগ কালার বটতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরটি আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। মণ্ডপে প্রতিমার রং ও সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের কাজ চললেও দর্শনার্থীদের ভিড় শুরু হয়েছে আগেই।
স্কুলশিক্ষার্থী তৃপ্তি রায়, চৈতি রায় ও তপতি চৌধুরী বলেন, স্কুল শুরুর আগেই তারা দুই মন্দিরের প্রতিমা দেখতে এসেছেন। সাহাপাড়া মন্দিরের প্রবেশপথে বড় হনুমান, রাম-লক্ষ্মণ-সীতার প্রতিমা এবং খরসংগ মন্দিরে বকাসুর বধ ও গোপাল ভাঁড়-মন্ত্রীসহ বিভিন্ন চরিত্রের মূর্তি তাদের ভালো লেগেছে।
আয়োজকেরা জানান, গত চার মাস ধরে দুই মন্দিরে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। সাতক্ষীরার ঘোষনগর গ্রামের শিমুল দাস (৩৫) সাড়ে তিন লাখ টাকা পারিশ্রমিকে সাহাপাড়া মন্দিরে ১৫২টি প্রতিমা তৈরি করেছেন।
অন্যদিকে, খরসংগ মন্দিরের প্রতিমা তৈরি করেছেন স্থানীয় ভাস্কর অভিলাষ মণ্ডল (৩০)। এ কাজের জন্য তিনিও সাড়ে তিন লাখ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছন। প্রতিমা দেখতে এর মধ্যেই দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়েছে।
ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে সাহাপাড়া মন্দিরে তুলে ধরা হয়েছে মা দুর্গার নয়টি রূপ, রথযাত্রা, রাম-সীতার কাহিনি, ভগীরথের সাত পুত্রের পুনর্জন্ম, রক্তবীজ ও মা কালীর বিভিন্ন কাহিনি। এ ছাড়া শিব, সরস্বতী, শ্রীকৃষ্ণসহ বড় হনুমানের মূর্তিও তৈরি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, খরসংগ মন্দিরে স্থান পেয়েছে ভীষ্মের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের অস্ত্র ধারণ, দক্ষযজ্ঞ, সত্যবানের মৃত্যু, ভীষ্মের রাক্ষস বধ, অর্জুন ও নাগকন্যা, রাজা হরিশচন্দ্রের শ্মশানঘাট, ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন, শ্রীকৃষ্ণের বকাসুর বধ এবং রামের সীতা উদ্ধারসহ নানা পৌরাণিক ঘটনাচিত্র।
খরসংগ কালার বটতলা সার্বজনীন পূজা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক সুব্রত সরকার বলেন, বিষয়টিকে প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখার কারণ নেই। একই এলাকায় দুটি মন্দিরে বিপুলসংখ্যক প্রতিমা তৈরি হওয়ায় দর্শনার্থীরা একসঙ্গে দুই মণ্ডপ ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন। এতে ডুমুরিয়ার রুদাঘরা ইউনিয়নেই দর্শনার্থীদের সমাগম বেশি হবে বলে আশা করছেন তারা।
তিনি আরও বলেন, শতবর্ষী এই মন্দিরের উন্নয়নে তারা কোনও সরকারি সহায়তা পান না।
সাহাপাড়া মন্দির কমিটির সভাপতি অধ্যাপক কার্তিক চন্দ্র সাহা বলেন, সাহাপাড়ার পূজারিদের অনুদানেই বিগত ৫২ বছর ধরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। মানুষের আনন্দই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ডুমুরিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি টুটুল কুণ্ডু বলেন, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে এবার ২২৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে রুদাঘরা ইউনিয়নের খরসংগ মন্দিরে ২০১টি এবং পাশের সাহাপাড়া মন্দিরে ১৫২টি প্রতিমা তৈরি করায় এলাকায় ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি নির্মল চন্দ্র বৈরাগী বলেন, ডুমুরিয়ার সব মানুষের সহযোগিতায় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে বলে তারা আশা করছেন।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে। উৎসবের দিনগুলো সবার আনন্দে কাটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘এবার জেলায় ৮১৮টি মন্দিরে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৯টি মন্দিরকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি মন্দিরে পোশাকধারী পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি কোস্টগার্ড, এসআরবি ও সাদাপোশাকের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিটি মন্দিরে পুলিশের ব্যানার আছে, যেখানে জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর দেওয়া আছে।’