কাঁকড়ায় মাইক্রোপ্লাস্টিক, মাছে বিষাক্ত সিসা: কে বাঁচাবে সুন্দরবন?

সুন্দরবন ও আশপাশের নদীর পানি ও মাটিতে মিলেছে বিপুল পরিমাণ অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এসব কণা বনের জলজ প্রাণীর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ছে। খোলপেটুয়া নদীর শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি ও অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন গবেষকেরা। অন্যদিকে, সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরের তিন প্রজাতির মাছের শরীরে পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত সিসা, নিকেল ও তামার মতো ভারী ধাতু। এ অবস্থায় সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে পর্যটকদের প্রবেশ কবে বন্ধ হবে, সে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। 

গবেষণার এসব ফল সুন্দরবনের জলজ পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দূষণ কমাতে নদীতে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ফেলা বন্ধ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বন বিভাগ। যদিও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে বলে দেখা যায়নি।

সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ও অরণ্যক ফাউন্ডেশনের পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৩ আগস্ট খুলনায় গবেষণাটির খসড়া প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে, পশুর নদে মাছের শরীরে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট। গত বছরের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ডিসকভার এনভায়রনমেন্টে এ গবেষণার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মো. আসাদুর রহমান বলেন, মাত্রাতিরিক্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত করছে। খাদ্যচক্রের মাধ্যমে এসব কণা বড় প্রাণীর শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে তারাও নানা জটিলতার শিকার হতে পারে।

তিনি বলেন, ‌সিসা, তামা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এসব ধাতুর সংস্পর্শ ক্যানসার, লিভার সিরোসিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সুন্দরবনের নদী ও মাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক

এর আগেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের উজান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য ও মাইক্রোপ্লাস্টিক সুন্দরবন হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়ছে। শুধু ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর ত্রাণসামগ্রীর মাধ্যমে বনের ভেতরে ৫৬ টনেরও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়েছিল।

খোলপেটুয়া নদীর শিলা কাঁকড়ার ফুলকায় গড়ে ১৮টি ও অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পেয়েছেন গবেষকেরা

বর্তমান পরিস্থিতি জানতে সুন্দরবনের নদীগুলোর পানি ও মাটিতে প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত তারা কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া এবং শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীর পানি ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন।

পরীক্ষায় খোলপেটুয়া নদীর প্রতি ঘনমিটার পানিতে ৫৭০টি, ভোলা নদীর পানিতে ৫৩০টি এবং শাকবাড়িয়া নদীর পানিতে ৩৬০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। একই সময়ে খোলপেটুয়া নদীর প্রতি কেজি পলিমাটিতে ৫৭টি, ভোলা নদীতে ৪৪টি এবং শাকবাড়িয়া নদীতে ৪৫টি প্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেন গবেষকেরা।খোলপেটুয়া নদীর শিলা কাঁকড়া পরীক্ষা করে এর ফুলকায় গড়ে ১৮টি ও অন্ত্রে ৩০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়।

সুন্দরবন এলাকার পানি ও পলি নিয়ে আগের বিভিন্ন গবেষণার তুলনায় এবারের গবেষণায় কিছু এলাকায় বেশি পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তবে গবেষণায় স্থানভেদে প্রতি ঘনমিটার পানিতে ২ থেকে ৫৩টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ১৭ থেকে ১৭৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। শিলা কাঁকড়ার শরীরে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিভিনাইল ক্লোরাইডের (পিভিসি) মতো প্লাস্টিকের উপাদানও পাওয়া গেছে।

‘সুন্দরবনে জলজ সম্পদের মূল্যায়ন’ শিরোনামে পরিচালিত গবেষণাটির প্রধান বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. এম এনামুল হক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রথমে জুপ্ল্যাঙ্কটন ও ছোট জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। পরে ধীরে ধীরে সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলের উচ্চস্তরের প্রাণীদের দেহে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, নদীর পলিতে আটকে থাকা প্লাস্টিক প্রাকৃতিক অণুজীব ও তলদেশের প্রাণীদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রও ধ্বংস করছে। সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে বড় পরিসরের পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

পশুর নদের মাছেও ভারী ধাতু

সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরের ছয়টি স্থান থেকে তিন প্রজাতির মাছের নমুনা সংগ্রহ করে ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকেরা। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মোংলা শিল্পাঞ্চল, মোংলা সমুদ্রবন্দর, বানিশান্তা, করমজল ও হারবাড়িয়া এলাকা থেকে পারশে, দাঁতিনা ও পাতা বাটা মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মাছ তিনটি নদীর ওপর, মধ্য ও নিচের অংশে বিচরণ করে।

পরীক্ষার প্রতিবেদনে প্রতি মাছের নমুনায় গড়ে ৪ দশমিক ৩৫ মিলিগ্রাম সিসা, ৩ দশমিক ৬ মিলিগ্রাম নিকেল, ১ দশমিক ৪২ মিলিগ্রাম তামা এবং ১ দশমিক ৪৬ মিলিগ্রাম ক্যাডমিয়াম পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। মাছের অন্ত্রে এসব ধাতুর ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি; এরপর ছিল ফুলকায়।

সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান নদ পশুরের তিন প্রজাতির মাছের শরীরে পাওয়া গেছে মাত্রাতিরিক্ত সিসা, নিকেল ও তামার মতো ভারী ধাতু

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহনশীল মাত্রার সঙ্গে তুলনা করে গবেষণায় বলা হয়েছে, মাছে সিসার সহনীয় মাত্রা দশমিক ২ থেকে দশমিক ৪ মিলিগ্রাম, ক্যাডমিয়াম দশমিক ০৫ থেকে দশমিক ১ মিলিগ্রাম, নিকেল দশমিক ৫ থেকে ১ মিলিগ্রাম এবং তামা ৩০ মিলিগ্রাম।

গবেষণাটির প্রধান ও বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টক্সিকোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইভানা পাভীন লিপি বলেন, পশুর নদের উজান থেকে আসা শিল্পবর্জ্য, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন এলাকা, মোংলা সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চলের অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীর পানি ও পলিমাটি দূষিত করছে। একপর্যায়ে এসব দূষক মাছের শরীরে প্রবেশ করছে। পশুর নদ ও সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় নদীর তীরবর্তী কলকারখানার বর্জ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শোধন না করে নদীতে ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে হবে।

প্লাস্টিক প্রবেশ বন্ধের দাবি

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, যৌথ নদী কমিশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে উজান থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য আসা বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি বলেন, সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং এর চারপাশের ১০ কিলোমিটারের পরিবেশগতভাবে সংকটপূর্ণ এলাকায় শিল্পকারখানা, কটেজ, রিসোর্ট ও নৌযানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বহন ও ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে প্লাস্টিকের মোড়কের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, মোংলা বন্দর ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সক্রিয় কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করা এবং নদীপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্রলার থেকে প্লাস্টিক ও তেলবর্জ্য ফেলা বন্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে, সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে পর্যটক ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিগগিরই সুন্দরবনে প্লাস্টিক নিয়ে প্রবেশ বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে বনের আশপাশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।