মায়ের সামনে মেয়েকে গুলি করে হত্যা: কারা এই ‘আশিক বাহিনী’

খুলনায় একের পর এক হত্যা, গুলি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অস্ত্রধারী ও বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিরা গ্রেফতার হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এসব আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনায় ৭৬ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। নগরীর বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, এরপর কে? কারণ একদিন কিংবা দুদিন পরই ঘটছে হত্যাকাণ্ড। 
 
খুলনায় সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী

খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম বারবার আলোচনায় এসেছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে আছে বি-কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ ও টেংকি শাওন গ্রুপ। 

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দুর্বল নজরদারির সুযোগে এসব গোষ্ঠী বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছে। এতে নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। 

তবে পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক বিশেষ অভিযান ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। গত ২৩ জুন লবণচরা এলাকা থেকে পারভেজ গাজী (৩২) নামের এক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, পারভেজ মহানগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত আশিক গ্রুপের শীর্ষ শুটার। 

সবশেষ খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানা এলাকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে খুশি বেগম (২৫) নামের এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়ার ৭ নম্বর গলি এলাকায় রিকশা থেকে নামার পর মায়ের সামনে মেয়েকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যায় জড়িত ব্যক্তি ‘আশিক বাহিনীর’ সদস্য বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের মা।

কারা এই ‘আশিক বাহিনী’

খুলনা মহানগরীর অন্যতম শীর্ষ জঘন্য ও ত্রাস সৃষ্টিকারী অপরাধী চক্র ‘আশিক বাহিনী’ (আশিক গ্রুপ)। সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং যৌথ বাহিনীর বিশেষ নজরদারির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এই সন্ত্রাসী গ্রুপ। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং পরিচালনা এবং প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া ও খুনাখুনির মতো একাধিক ভয়ংকর অপরাধের মাধ্যমে চক্রটি পুরো খুলনাজুড়ে আতঙ্ক তৈরি করেছে তারা।

বাহিনীর পরিচয়

খুলনা মহানগরীর চানমারী এলাকার বাসিন্দা আশিক ইসলাম নিজ নামে এই ‘আশিক বাহিনী’ বা ‘আশিক গ্রুপ’ গড়ে তোলেন। অপরাধ জগতে তার প্রবেশ ঘটে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি হত্যা মামলায় জড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে। বর্তমানে সে এবং তার ভাই সজিবের নেতৃত্বে নগরীতে একটি ভয়ঙ্কর গ্যাং কালচার ও অপরাধের সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ শাখার অপরাধীদের তালিকায় এই গ্রুপটির নাম শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।

অপরাধের ধরন ও এলাকা

আশিক বাহিনী মূলত খুলনার লবণচরা ও সদর থানা এলাকায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। এদের প্রধান অপরাধের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে কিশোর গ্যাং ও অস্ত্রের মহড়া। এলাকার উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকদের দলে ভিড়িয়ে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করে ত্রাস সৃষ্টি করা।

চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার

চানমারী বাজার, রূপসা এবং লবণচরা সংলগ্ন বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ওপর চাঁদাবাজি চালানো এদের কাজ। বিভিন্ন ধরনের মাদক ও ইয়াবা ব্যবসার সাথে এই চক্রের গভীর সংশ্লিষ্টতা আছে।

কে এই আশিক?

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, খুলনা শহরের বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করা সন্ত্রাসী গ্রুপ আশিক বাহিনী। এই বাহিনীর নাম কেএমপির তালিকায় রয়েছে, যেখানে বাহিনীপ্রধান হিসেবে নাম রয়েছে আশিকের। আশিকের বাড়ি চানমারী এলাকায়। আশিকের বাবা জুলফিকার আলী ওরফে জুলফি ছিলেন সুন্দরবনের কুখ্যাত ডাকাত। তিনি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হন। তখন আশিক বয়সের কম থাকলেও ধীরে ধীরে কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে অপরাধ জগতে পা বাড়ায়।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম হত্যা মামলায় নাম আসে আশিকের। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় তার নামে ১০টি মামলা হয়েছে। আশিক নিজে গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও তার বাহিনীর সদস্যরা খুলনায় দাপট দেখিয়ে যাচ্ছে। জমি দখল, ঘাট-ভেড়ি দখল, পরিবহনে চাঁদাবাজির মতো কাজ করে থাকেন আশিকের অনুসারীরা।

পুলিশ ও গোপন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আশিক বাহিনীতে অস্ত্রধারী সদস্য ৩০ জনের মতো। এসব অস্ত্রধারীদের নামে বিভিন্ন থানায় শতাধিক মামলা আছে।

খুলনায় ‘ওপেন সিক্রেট’ নাম আশিকের প্রধান সহযোগী ফয়সাল। খুলনা সদরের দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা এই ফয়সালের নাম প্রথম হত্যা মামলায় আসে ২০১৬ সালে। ২০১৮ সালে আশিকের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয় এবং আশিক বাহিনীর প্রধান অনুচর হিসেবে ভূমিকা রাখা শুরু করেন তিনি। এই ফয়সালের নামে বিভিন্ন থানায় আটটি মামলার তথ্য রয়েছে।

আশিক বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম বস মিজান, আব্দুল্লাহ, পালসার সোহেল, কাউট বাসার, জাহিদুল ইসলাম, হেলাল, নাদিম, ডালিম, পারভেজ, দুলাল, অপু, সাগর লেলিন, জিহাদ হোসেন জিয়া, আরমান, সাইফুল ইসলাম পিটিল, গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যারা মোস্ত, মো. ইয়াছিন, মো. নিয়াজ মোর্শেদ, শেখ বাবুল এবং স্পিকার মিরাজ। এর মধ্যে পিটিল জোড়া হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড নিয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আর কয়েকদিন আগে স্পিকার মিরাজকে গ্রেফতার করেছে এসআরবি।

দাপুটে নাম গ্রহণকারী বস মিজান, ট্যারা মোস্ত, স্পিকার মিজান খুবই ভয়ংকর স্বভাবের, হামলা-হাঙ্গামায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ডজনের ওপরে মামলা রয়েছে।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, বছর দশেক আগে এলাকার কিশোরদের নিয়ে ‘কিশোর গ্যাং’ তৈরি করে আশিক। দলবেঁধে মহড়া দিয়ে শক্তি প্রদর্শন করতেন তারা। সেই দাপটের ফল হিসেবে তাদের হাতে আসে মাদক ও অস্ত্র। জনশ্রুতি আছে, সেই জোরে জমি দখলের কাজ পেতে শুরু করেন আশিক। বর্তমানে খুলনা শহরের মাদক কারবারেও আশিক বাহিনী শীর্ষে রয়েছে। আশিকের সঙ্গে তার বড় ভাই সজিবের নামও জড়িয়ে রয়েছে এই সন্ত্রাসী জগতে। গত বছর বিপুল পরিমাণ মাদকসহ যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন সজীব।

সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান

২০২৬ সালের মধ্যভাগ থেকে যৌথ বাহিনী এবং পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের ফলে আশিক বাহিনীর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও শুটার গ্রেফতার হয়েছে। তবে পুলিশের তৎপরতার কারণে মাঝে মাঝেই এই গ্যাংটির ওপর পাল্টা হামলার ঘটনাও ঘটে। গত জুলাই মাসে বাহিনীর প্রধান আশিকের আপন বোন ইতিকে লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষ গ্রুপের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করেছিল।

বাহিনীর প্রধান প্রধান সহযোগীদের তালিকা ও গ্রেফতার

যৌথ বাহিনী এবং পুলিশের নিয়মিত অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ও বর্তমানে চিহ্নিত আশিক বাহিনীর শীর্ষ সদস্যরা হলেন- পারভেজ গাজী ওরফে শুটার পারভেজ। লবণচরা থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার হওয়া এই অপরাধী আশিক গ্রুপের অন্যতম শীর্ষ শুটার হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

গত আগস্ট মাসে নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে বাহিনীর সদস্য শিবলী হোসেন রুবেলকে একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। পরে চানমারী বাজার ও মতিয়াখালী এলাকা থেকে র‍্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হওয়া বাহিনীর দুই সক্রিয় মাঠ পর্যায়ের সহযোগী। তারা হলেন ইমন শরীফ ও সজল খান। এরপর যৌথ বাহিনীর অভিযানে দেশীয় পাইপগান এবং ইয়াবাসহ আরেক সক্রিয় সদস্য ইয়াসিনকে গ্রেফতার করা হয়।

মহানগরীতে ৩৮ হত্যাকাণ্ড

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। কারণ একাধিক হত্যার ঘটনায় একটি মামলা হওয়ায় মোট মামলার সংখ্যা ২৩টি। এসব মামলার মধ্যে পুলিশের হিসাবে ১৯টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন ৮১ জন। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে। 

পুলিশ বলছে, রহস্য উদঘাটন হওয়া ১৯টি মামলার ১৭টি তদন্তাধীন এবং দুটি বিচারাধীন। এগুলোর ১৪টিতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, নয়টি হত্যায় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, সাতটিতে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব, দুটিতে ইজিবাইক চুরি এবং একটি চোর সন্দেহে পিটুনির ঘটনা।

জেলায় ৩৫ হত্যাকাণ্ড

খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনা জেলার নয়টি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২৫টির রহস্য উদঘাটন হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি হত্যা ঘটেছে গুলিতে। পারিবারিক বিরোধে চারটি, শ্বাসরোধে দুটি, রাজনৈতিক কারণে দুটি, সামাজিক বিরোধে ১৩টি, কুপিয়ে তিনটি আর দুটি অজ্ঞাত কারণে। এর মধ্যে গুলিতে নয়টি ও কুপিয়ে তিনটি ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক, চুরি-ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তার।