ড্রেজিং হচ্ছে তবু বাড়ছে না জাহাজ, কেন পিছিয়ে মোংলা বন্দর?

মোংলা সমুদ্রবন্দরে জাহাজ আগমনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, নাব্য সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব সমস্যা দূর করা না গেলে শুধু ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বন্দরের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মোংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন, সেবার মান বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন তারা। তাদের মতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হতে পারে।

বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মোংলা সমুদ্রবন্দর পরিদর্শন করেছেন। তার এই সফরকে কেন্দ্র করে মোংলা ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উদ্যোগে বন্দরের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে।

তারা মোংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার উপযোগী করে তোলার দাবি জানিয়েছেন।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার আলী বলেন, বন্দরের চ্যানেলে নিয়মিত পর্যাপ্ত নাব্য বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বড় আকারের অনেক বিদেশি জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। চ্যানেলের গভীরতা বাড়ানো এবং নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্য ধরে রাখা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, মোংলা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।

জুলফিকার আলীর মতে, বন্দরে খালাস করা পণ্য দ্রুত ও কম খরচে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দিতে সড়ক ও রেলপথের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন হলে আমদানি-রফতানিকারকদের সময় ও ব্যয় দুটোই কমবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরে মোংলা বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা, জেটি এলাকা এবং বড় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার বিষয় রয়েছে। চীনা বিনিয়োগ এবং নতুন জেটি নির্মাণও সফরের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, চীন সরকারের সঙ্গে পূর্বে চুক্তিবদ্ধ মোংলা বন্দরের নতুন জেটি নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এ সফরকে কেবল আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বন্দর, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা এবং পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, মোংলা বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ী নেতারা মোংলা বন্দরকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সমকক্ষ ও পরিপূরক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পক্ষে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, মোংলা বন্দরের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। নাব্য রক্ষা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, জ্বালানি সরবরাহ এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন জেটি নির্মাণ ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।