কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত যশোরের মণিরামপুরের একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ ১১ দিন পর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। বুধবার ভোরে মরদেহগুলো মোহনপুর গ্রামে পৌঁছানোর পর সেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। চলছে জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি।
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টের অব্যবস্থাপনার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। তারা অবৈধ রিসোর্ট বন্ধের পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটিতে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী আফসানা খাতুন এবং দুই মেয়ে ইনায়া ও ইহানা। ১৬ অক্টোবর তারা ইনানীর ওই রিসোর্টে ওঠেন। ১৮ অক্টোবর দুপুরে তাদের চেকআউট করার কথা ছিল। তবে এর আগেই ১৭ অক্টোবর ভোরে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার কারণে মরদেহ শনাক্ত করতে সময় লাগে। গত সোমবার বিকালে কক্সবাজার পুলিশ ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পায়। এরপর আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঙ্গলবার দুপুরে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বুধবার ভোরে সেগুলো গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়।
নাহিদুররা দুই ভাই। চাকরির কারণে দুই ভাই গ্রামের বাইরে থাকতেন। মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ায় ‘ফারজানা ম্যানশন’ নামে দোতলা বাড়িটিতে নাহিদুরের বৃদ্ধ বাবা মতিয়ার রহমান একাই থাকেন।
বুধবার দুপুরে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড় জমেছে। বাড়ির বারান্দার পাশে একটি চেয়ারে বসে আছেন মতিয়ার রহমান। তাকে ঘিরে স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে তিনি শোকে স্তব্ধ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মতিয়ার রহমান বলেন, আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। তখন সে আমাকে বলেছিল, বাবা তুমি চিন্তা করো না। তোমার নাতনিরা সি-বিচে আছে, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরবো। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো।’ সেটাই ছিল শেষ কথা। আর কথা হবে না।
নাতনিদের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ছুটিতে গ্রামে এলে নাতনিরা বাড়ি মাতিয়ে রাখতো। কত খেলতাম তাদের সঙ্গে! আর কিছুই হবে না। ফুলের মতো নিষ্পাপ বাচ্চারাও পুড়ে মারা গেছে। কত কষ্ট পেয়েছে আমার সোনার মানিকেরা!
নিহত নাহিদের ফুফা আব্দুল লতিফ বলেন, কর্মজীবী মানুষ একটু সময় পেলেই বিনোদনের জন্য রিসোর্টে যান। কিন্তু সেই রিসোর্ট যদি অনিয়ন্ত্রিত হয় কিংবা অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেখানে সব সময়ই জীবনের ঝুঁকি থাকে। এমন অব্যবস্থাপনার কারণে তাজা প্রাণগুলো অকালে ঝরে গেলো। এর দায়ভার কে নেবে? আমাদের একটি পরিবার শেষ হয়ে গেলো। তাদের তো আর ফিরে পাবো না। তবে এসব অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বেলা তিনটার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে চারজনকে দাফন করা হবে। তাদের দাফনের জন্য সকাল থেকেই কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেন গোরখোদক। নাহিদের মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে নাহিদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে।
কবর খোঁড়ার দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ষাটোর্ধ্ব রবিউল ইসলাম। মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা তিনি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, এতদিন শুধু শুনেছি একসঙ্গে একাধিক মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে। এবার নিজের চোখে দেখছি, পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়েছে। একই পরিবারের চারজনকে দাফন করা হবে। এর আগে আমাদের গ্রামে এমন দৃশ্য দেখিনি।
নিহত নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তিনি রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন। কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে তাদের মৃত্যুর পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে মঙ্গলবার তাদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।