গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে হাজারো মানুষের সমাগম। মাঠের পশ্চিম পাশে চারটি খাটিয়াতে সাদা কাফনে মোড়ানো মরদেহ। মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে একজন আরেকজনকে ধরে কাঁদছেন। একসঙ্গে চারজনের জানাজা এর আগে কখনও হয়নি এই গ্রামে। নিহতদের স্বজন, গ্রামবাসী আর দূরদূরান্ত থেকে আসা সবার দৃষ্টি চারটি খাটিয়ার দিকে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী গ্রামের বাতাস। কাঁদছেন প্রতিবেশীরাও।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বেলা ২টার দিকে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামে। গত ১৭ অক্টোবর ভোরে কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের দুই শিশুসন্তানের মৃত্যু হয়েছিল। তারা হলেন- এই গ্রামের নাহিদুর রহমান (৪১), স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৭) ও মুনাইনা ইহানা (৩)।
ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা ছিলেন নাহিদুর। পরিবার নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন। ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্ত হওয়ায় ১০ দিন পর মঙ্গলবার বিকালে তাদের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে স্বজনদের হস্তান্তর করা হয়। নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান তাদের মরদেহ গ্রহণ করেন। এরপর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে জানাজার জন্য একসঙ্গে চারটি খাটিয়াতে করে মাঠে রাখা তাদের মরদেহ। অপরদিকে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়। বিকাল সাড়ে ৩টায় জানাজা শেষ হয়। এরপর একে একে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের দুই শিশুসন্তানকে দাফন করা হয়। এ সময় গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। একসঙ্গে ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন নাহিদুরের বাবা মতিয়ার রহমান। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা কারও ছিল না।
জানাজায় অংশ নেওয়া লোকজন জানিয়েছেন, একসঙ্গে পাশাপাশি চারটি কবরে এক পরিবারকে কবর দেওয়ার দৃশ্য এই গ্রামের মানুষ আগে দেখেনি। এ যেন চারটি মানুষকে নয়; দাফন করা হলো একটি পরিবারকে।
পূজার ছুটিতে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান নাহিদুর, তার স্ত্রী আফসানা ও তাদের দুই শিশুসন্তান। ১৬ অক্টোবর তারা টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। ১৮ অক্টোবর দুপুরে তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল। এর আগেই ১৭ অক্টোবর ভোরে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে ওই পরিবারসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়। যাদের মরদেহ পুড়ে একবারেই অঙ্গার হয়ে যায়। এজন্য আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার কারণে মরদেহ শনাক্ত করতে সময় লাগে। মঙ্গলবার বিকালে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এরপর মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বুধবার সকালে মোহনপুর গ্রামের বাড়িতে চারজনের মরদেহ পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে জানাজার প্রস্তুতি। পরে স্থানীয় বাঁধাঘাট মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাশাপাশি চার খাটিয়াতে চারটি মরদেহ রেখে জানাজা পড়ানো হয়। এতে নানা শ্রেণিপেশার হাজারো মানুষজন অংশ নেন। পরে মরদেহ চারটি নেওয়া হয় পারিবারিক কবরস্থানে। সেখানেই তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়।
প্রথমে মায়ের কবরের পাশে নাহিদুরকে দাফন করা হয়। তার পাশে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে দাফন করা হয়। একসঙ্গে একটি পরিবারকে দাফন করতে দেখে কেঁদে ফেলেন গোরখোদক রেজাউল করিম। তিনি বলছিলেন, ‘এতদিন শুধু লোকমুখে শুনেছি একসঙ্গে একাধিক মানুষকে কবর দেওয়ার কথা। এবার নিজের চোখে ও নিজেই এক পরিবারের চারজনের জন্য পাশাপাশি চারটি কবর খুঁড়েছি। কবর খোঁড়ার এই ৪০ বছরের জীবনে এমনটি আর হয়নি। মনে হচ্ছিল চারটি মানুষকে নয়; একটি পরিবারকে দাফন করলাম।’
এদিকে স্বজনদের দাবি অনুমতিবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর কারণে আজ এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গেলো। অবিলম্বে অবৈধ রিসোর্ট বন্ধ এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নাহিদুরের ফুফা আব্দুল লতিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সাধারণত যারা কর্মজীবী মানুষ তারা একটু সময় পেলেই বিনোদনের জন্য রিসোর্টে যায়। কিন্তু সেই রিসোর্টগুলো যদি অনিয়ন্ত্রিত কিংবা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা যদি না থাকে—তাহলে সেখানে কিন্তু সবসময়ই জীবনের ঝুঁকি থাকে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে এরকম তাজা প্রাণগুলো যে অকালেই ঝরে গেলো, এর দায়ভার কে নেবে? আমাদের তো একটা পরিবার শেষ হয়ে গেলো; এখন আর ফিরে পাবো না। তবে রিসোর্টগুলোর অব্যবস্থাপনা সংস্কার ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
নাহিদুরের বাবা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। এর মধ্যে ছোট ছেলের পুরো পরিবার শেষ। একে আমি দুর্ঘটনা বলবো না, এটি হত্যাকাণ্ড। অনুমতিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোর কারণে আজ আমার পরিবারের চারটি প্রাণ ঝরে গেলো। এই রিসোর্টগুলো অস্থায়ীভাবে কাঠের তৈরি। সরকারের কাছে আবেদন, এই সমস্ত রিসোর্ট যেন না থাকে, না থাকে। এগুলোর মালিকের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।’
দুপুরে নিহতদের পরিবারের স্বজনদের সমবেদনা জানাতে যান মনিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন। তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে একটি পরিবার শেষ হয়ে গেলো। নিহতদের পরিবারকে জেলা প্রশাসন থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।’