ময়মনসিংহের দুই ‘জঙ্গি আস্তানা’র একটি এখন কমিউনিটি সেন্টার, অন্যটিতে থাকেন ভাড়াটিয়া

কালিবাড়ি রোডের এই বাড়িতেই ছিল জঙ্গিদের আস্তানাময়মনসিংহের দুই ‘জঙ্গি আস্তানা’ এখন বাড়ির মালিকদের তত্ত্বাবধানে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বাড়ি বাণিজ্যিক কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যটি আগের মতোই বসবাসের জন্য ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও জেলা পুলিশ বলছে, বাড়ি দু’টির ওপর এখনও তাদের নজরদারি রয়েছে।

২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের কালিবাড়ি রোডে আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল কাদিরের বাসা থেকে সাত জঙ্গিকে আটক করে ময়মনসিংহ পুলিশ। কালিবাড়ি রোডের বিশাল জায়গা জুড়ে একটি ডুপ্লেক্স ও একটি চারতলা ভবনসহ একাধিক বাসার মধ্যে একটি আধাপাকা টিনের বাসা থেকে ওই জঙ্গিদের আটক করা হয়। কোতোয়ালি মডেল থানায় এসব জঙ্গির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। বর্তমানে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে।

জঙ্গি আস্তানার সেই বাড়ি এখন পার্টি সেন্টারপ্রয়াত সংসদ সদস্য আনোয়ারুল কাদিরের এই বাসার বিশাল জায়গা জুড়ে মোট চারটি বাসা রয়েছে। এর মধ্যে দু’তলা ডুপ্লেক্স ভবনটির মালিক আনোয়ারুল কাদিরের প্রয়াত ছেলে পাপ্পুর স্ত্রী কেয়া। এই বাড়ি ভাড়া দিয়ে গৃহবধূ কেয়া থাকেন শহরের আকুয়া এলাকায়। এছাড়া চারতলা ভবনটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে সূর্যের হাসি নামের একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানকে। এই ভবনটির মালিক আনোয়ারুল কাদিরের আরেক ছেলে মুরাদ। চারতলা এই ভবনটি ভাড়া দিয়ে তিনি মাকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। আধাপাকা টিনের একতলা বাড়িটির মালিকও মুরাদ। গত এক বছর আগে এই বাড়িটিই ভাড়া দেওয়া হয় কয়েকজনকে। একটি ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির চিপস ও বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী বিক্রির আড়ালে এই বাসায় থেকে গোপন তৎপরতা চালাচ্ছিল আটক ওই সাত জঙ্গি।

এই ঘটনার কয়েক দিন পর বাসাটি থেকে ভাড়াটিয়াদের বের করে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গি আস্তানা হিসেবে পরিচিত বাড়িটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়েছিল। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল কাদিরের প্রয়াত পুত্র সাদেক আনোয়ার পাপ্পুর স্ত্রী জোবেদা আনোয়ার কেয়া জঙ্গি আস্তানা হিসেবে চিহ্নিত এই বাড়িটির ইমেজ পাল্টাতে এতে গড়ে তোলেন ‘স্পন্দন পার্টি সেন্টার’ নামে একটি কমিউনিটি সেন্টার। বর্তমানে কমিউনিটি সেন্টারটি বাণিজ্যিক ভাবে ভাড়া দিচ্ছেন তিনি।

হবির বাড়ির এই ঘরেই বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল জঙ্গিজোবেদা আনোয়ার কেয়া জানান, জঙ্গি আটকের কিছুদিন পর ভাড়াটিয়াদের চলে যেতে বলা হয়। বর্তমানে এই বাড়িটিকে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে পুলিশের লোকজন মাঝে মধ্যে এই বাড়ির বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এখন তারা আর আসেন না। ব্যবসায়ের বিষয়ে তারা কোনও আপত্তিও জানাননি।’

এদিকে,২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট ভালুকার হবিরবাড়ির কাশর গ্রামের আজিম উদ্দিনের বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়ে পুলিশ অভিযান চালায়। অভিযান চলাকালে ঘরের ভেতর বোমা বিস্ফোরণে নব্য জেএমবি সদস্য নাটোর সদর উপজেলার তেলকুপি গ্রামের আবুল কালাম প্রামাণিকের ছেলে আলম প্রামাণিক (৩৫) মারা যায়। এসময় আটক করা হয় আলম প্রামাণিকের স্ত্রী পারভিন আক্তারকে (৩০)।

এসময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা বাড়ির মালিক আজিম উদ্দিনের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন (৪০),ছেলে হাসান ও আরিফকে। এইস ঘটনায় ভালুকা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছেন।

আজিম উদ্দিনের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন জানান, ঘটনার ১৫ দিন আগে আলম প্রামাণিক তাদের বাড়ি ভাড়া নিয়ে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকতে শুরু করে। ঘটনার দিন অভিযান চলাকালে আলম প্রামাণিক বোমার আঘাতে মারা যায়। বর্তমানে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মাঝে মাঝে পুলিশ এসে খোঁজ খবর নিয়ে যাওয়ার কথা জানান ফাতেমা খাতুন।

জঙ্গি আস্তানা হবিরবাড়িতে অভিযান চলার সময়জেলা গোয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর রহমান জানান, ময়মনসিংহ শহরের কালিবাড়ি অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল কাদিরের বাড়ি থেকে আটক হওয়া নব্য ৭ জেএমবি সদস্য আদালতের নির্দেশে জামিনে আছে।  মামলার তদন্ত কাজ এখনও শেষ হয়নি। ওই বাড়িটি এখনও পুলিশের নজরদারিতে আছে।  ভালুকার হবির বাড়ির মামলার তদন্ত কাজ চলছে। ওই বাড়িটিও পুলিশের নজরদারিতে আছে বলেও জানান তিনি।

জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জয়িতা শিল্পী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ময়মনসিংহে উদ্ধার হওয়া দু’টি ‘জঙ্গি আস্তানা’র বাড়িগুলো এখনও পুলিশের নজরদারিতে আছে। নতুন করে এই বাড়িগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এ বিষয়ে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করা হয়।