২৬ বছরেও বকেয়া মজুরি পাননি ময়মনসিংহ জুট মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা

 

mymensingh-jute-mill-sromik-2২৬ বছরেও বকেয়া মজুরি পাননি ময়মনসিংহ জুট মিলের শ্রমিক -কর্মচারীরা। বকেয়া পাওনার আশায় থেকে এরইমধ্যে মারা গেছেন অনেকে। আর চাকরি হারিয়ে বেঁচে থাকা পরিবারগুলোর মানবেতর দিন কাটছে।
ময়মনসিংহ জুট মিলের সাবেক কোয়ালিটি কন্ট্রোলার আব্দুর রাজ্জাক জানান, মিলটি বন্ধ ঘোষণার সময় ১২ শতাধিক শ্রমিক কর্মচারীর বকেয়া ছিল ১ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। মিল বন্ধ করার ২৬ বছরেও এই পাওনা পরিশোধ করেনি সরকার।
শ্রমিক কর্মচারী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, পাওনা পরিশোধের আশায় থেকে ইতোমধ্যে অনেক শ্রমিক-কর্মচারী মারা গেছে। আর চাকরি হারিয়ে যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাদের দিন কাটছে অর্ধাহারে -অনাহারে। জীবন বাঁচাতে অনেকে বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো, চা-পান বিক্রি ও কুলি মজুরির মতো কাজে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
ময়মনসিংহ জুট মিল শ্রমিক কর্মচারী কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি লি. এর সাবেক কার্যকরী কমিটির সভাপতি মোশারফ হোসেন অভিযোগ করেন, বন্ধ ঘোষণার পর ২০০৩ সালে বেসরকারি উদ্যোগে মিলটি চালুর জন্য আহ্বান করা দরপত্রে সরকার শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধের দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত তা পরিশোধ করা হয়নি। এছাড়া বারবার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে বকেয়া মজুরি পাওয়ার জন্য আবেদন করেও কোনও লাভ হয়নি।
এই প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সাবেক কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের বকেয়া পাওনা পরিশোধের ব্যাপারে সরকার খুবই আন্তরিক। এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
mymensingh-jute-mill-sromik-4স্ত্রী, চার ছেলে আর এক কন্যা সন্তানকে নিয়ে বেশ ভালোই কাটছিল ময়মনসিংহ জুট মিলের কারিগরি বিভাগের শ্রমিক কর্মচারী জালাল উদ্দিনের (৬২)।কিন্তু,১৯৯৩ সালে শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা মজুরি পরিশোধ ছাড়াই মিলটি বন্ধ ঘোষণা করে বিএনপি সরকার। পরে ধার-দেনা করে মিল গেটে চা-পানের দোকান দেন তিনি।
জালাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেশ ভালোই চলছিল মিলের উপার্জনে। পরিবার পরিজন নিয়ে সুখেই ছিলাম। ওই সময়ে মিলটি প্রায় ৫০ মেট্রিক টন উৎপাদনে ছিল। তারপরও লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে বিএনপি সরকার মিলটি বন্ধ ঘোষণা করে। অথচ শ্রমিক কর্মচারীদের ঘামের পাওনা টাকা পরিশোধ করা হয়নি।’
নূর জাহানের (৫০) জানান, ৫ ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে বেশ ভালোই কাটছিল তাদের দিনগুলো। কিন্তু, ২৭ বছরের চাকরির মাথায় মিল বন্ধ হয়। এর ১২ বছরের মাথায় মারা যান তার স্বামী ইমাম উদ্দিন সরদার।
নূর জাহান বেগমের বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী সদয় হলে নিশ্চয়ই ময়মনসিংহ জুট মিলের চাকরিচ্যুত শ্রমিক-কর্মচারীরা পাওনা বুঝে পাবেন। তিনি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
সদর উপজেলার চরঈশ্বরদীয়া গ্রামের আবুল কালাম (৬০) চাকরি হারানোর পর থেকে কখনও কুলি মজুরি, আবার কখনও ক্ষেত মজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। পাশের চরঈশ্বর দিয়া গ্রামের রমজান আলী রঞ্জু (৫০) বয়সের ভারে এখন আর কোনও মজুরি খাটতে পারছেন না। তিনি পাবেন ৭৫ হাজার টাকা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪ সালে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র পাড়ের চরকালিবাড়ি গ্রামে ৬৪ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় ৫শ তাঁত বিশিষ্ট ময়মনসিংহ জুট মিল। তখনকার শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৭৪ সালের ৯ মে মিলটি উদ্বোধন করেন। পাটের জেলা হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ জেলা তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে ময়মনসিংহ জুট মিলই ছিল একমাত্র ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের উৎপাদিত পাটের সিংহভাগ প্রয়োজন পড়তো ময়মনসিংহ জুট মিলের উৎপাদনে। ১৯৭৪ সালে উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে সরকারের লাভজনক মিলের তালিকায় ছিল ময়মনসিংহ জুট মিলটি। এসময়ে নিয়মিত ও অনিয়মিতসহ প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছিল জুট মিলে। ময়মনসিংহ জুট মিলের ওপর ভর করে মিলগেট ছাড়াও অনেক হাট-বাজার গড়ে উঠেছিল।