‘আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে...., পূবালী বাতাসে......... বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি......... আমার নি কেউ আসে রে...আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানিরে.....’ উকিল মুন্সীর কালজয়ী এ গানটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বর্ষার পানিতে ভাসা হাওরের ছবি। শহরের মানুষ বর্ষায় হাওর ঘুরতে গেলে এই চিত্র দেখে অনেক আনন্দিত হয়। বাইরে থেকে দেখে হাওরপাড়ের মানুষের জীবন চিত্র যতটা মনোমুগ্ধকর মনে হয়, বাস্তবে এর চিত্রটা ঠিক বিপরীত। কঠিন সংগ্রামের মাধ্যমে হাওরের মানুষ তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। এই হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহ করা যেমন কষ্টকর তেমনি তাদের নেই কোনও নির্দিষ্ট যাতায়ত ব্যবস্থা। বর্ষার সময় নৌকা আর শুকনো মৌশুমে পায়ে হেঁটে শহরের আসেন তারা। তাদের এই সংগ্রামী জীবনে অনেকটা আশার আলো ফুটিয়েছে ও যাতায়াত ব্যবস্থাকে দ্রুত করছে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল।
এটি একদিকে যেমন হাওরের মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থাকে সহজ করেছে তেমনি অসংখ্য যুবককে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিচ্ছে।
বর্ষার থৈ থৈ পানিতে নৌকায় ভেসে ভেসে হাওর পাড়ি দিলেও শীত কিংবা বসন্তে চলতে হয় ধূলিমাখা মেঠো পথে। দূরপথের তখন ভরসা হয়ে দাঁড়ায় মোটরসাইকেল। কখনও জেলার গণ্ডি পেরিয়ে এই যানেই স্থানীয়রা ছুটে যায় অন্য জেলায়।
মোহনগঞ্জ পৌরশহরের টেঙ্গাপাড়া মোড়, যা এখন মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড হিসেবেই বেশি পরিচিত। এখান থেকেই হাওরের বিভিন্ন গ্রামে যাতায়াত করেন নারী-পুরুষ।
খালিয়াজুরির জয়খড়া হাওর বাজারের মনোহরী দোকানি আবদুল আলী বলেন, ‘কয়দিন ধইরা আমরার এইনও মোটরসাইকেল জনপ্রিয় অইছে। ভাইস্যা (বর্ষা) মাসে হানি (পানি) অওয়ায় পথ-ঘাটে অন্য কোনও গাড়ি-ঘোড়া চলে না, তহন এইডাই চলে।’
বছর খানেক আগেও অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া তরুণ জসিম উদ্দিন বেকার ছিলেন। বাবার পকেট থেকে ‘চুরি’ করে হাত খরচার পয়সা নিতেন তিনি। কিন্তু এখন মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি সংসারেও সহযোগিতা করছেন। শুধু জসিমই নয় এখন অনেকেই এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
মদনে জাহাঙ্গীরপুর সেন্টার মোড় আর মোহনগঞ্জ টেঙ্গাপাড়া মোড়ে মোটরসাইকেলের নির্ধারিত স্ট্যান্ড রয়েছে। এছাড়া নেত্রকোনা সদরের, চাঁন খার মোড়, রাজুর বাজার, খাদ্য গুদাম মোড়, বারহাট্টা, কলমাকান্দা, খালিয়াজুরির স্ট্যান্ডে যাত্রী সমাগম বেশি। অনেকেই মোবাইল ফোনে কল করে মোটরসাইকেল চালকরাদের বাড়িতে নিয়ে যান। দিনরাত প্রায় ২৪ ঘণ্টাই সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে ছুটে চলেন তারা। সচেতন নাগরিকরা পেশাটিকে প্রশংসা করে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকদের নির্দিষ্ট পোশাক পরিধানের পরার্মশ দেন। না হলে যাত্রী সাধারণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে অন্য মোটরবাইককে গতি রোধ করে বিড়ম্বনায় ফেলে দেন।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, মোটরসাইকেল চালিয়ে অনেক বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে চলাচলকারীদের বেশিরভাগেরই বাইকের রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। নতুন চালকরা দুর্ঘটনাতেও পড়েন। তাই বিভিন্ন সময় যথাযথভাবে কাগজপত্র না পাওয়া গেলে জরিমানাও করা হয়েছে। দূর-দূরান্তে চলার সময় যাতায়াতের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল আরোহীর প্রত্যেককে হেলমেট ব্যবহারের পরার্মশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
/জেবি/এসটি/