সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম হত্যাকাণ্ডের পর থেকে একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে থলের বিড়াল। তাকে হত্যার পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল। বিষয়টি উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকেরই জানা ছিল। তবু চুপ ছিলেন তারা। তাই তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। এরই মধ্যে মঙ্গলবার (২০ জুন) হত্যার পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট একটি অডিও ক্লিপ ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ায় এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ভাইরাল অডিও ক্লিপটি নাদিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রধান আসামি মাহমুদুল আলম বাবু চেয়ারম্যানের বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দুই মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ভাইরাল হওয়া ওই অডিও ক্লিপে চেয়ারম্যানকে বলতে শোনা যায়, ‘সাংবাদিক নাদিমকে ঠিক করা এক মিনিটের বিষয়।’ এই বক্তব্যটি দুই-আড়াই মাস আগে বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের অফিসে এক সভায় দিয়েছিলেন বাবু। ওই সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। সভায় উপস্থিত সবাইকে হাততালি দিয়ে তার বক্তব্যকে স্বাগত জানাতে শোনা যায়।
উপস্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কথা শোনে না, এমন দুঃসাহস কার আছে। যতক্ষণ আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আছে, যতক্ষণ সংসদ সদস্য রয়েছে, যতক্ষণ উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি রয়েছে, তার বাইরে একটি কথা বলার এখতিয়ার নাই কারও।’
তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘যাদের কোনও ক্ষমতা নাই, যাদের কোনও দাপট নাই, যাদের কোনও পয়সা নাই; তাদের কোনও পোস্ট-পদবি দিয়েন না। মূলত গরিব লোকের রাজনীতি করতে নাই। গরিব লোকরে কেউ দেখতে পারে না, গরিব লোকরে তো আল্লাহও দেখতে পারে না, আমি দেখবো কী করে।’ এ সময় সভায় উপস্থিত সবাই আবারও হাততালি দিয়ে তার এই বক্তব্যকে সমর্থন করেন। অডিওর শেষের দিকে একজন নেতাকে এক মিনিটের মধ্যে তার (চেয়ারম্যান) বক্তব্য শেষ করতে বলতে শোনা যায়।
স্থানীয়রা জানান, বাবু চেয়ারম্যান দুর্ধর্ষ লোক। যে কারণে তার ভয়ে মুখ খোলার সাহস পেতো না কেউ। তার সব অপকর্মের সহযোগিতা করতেন উপজেলার কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা। তাদের পথের কাঁটা ছিলেন সাংবাদিক নাদিম। তাই মেরে ফেলার জন্য আগেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই বক্তব্য তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
এ বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিক এমদাদুল হক লালন বলেন, ‘নাদিম সংবাদ প্রকাশ করায় দুই-আড়াই মাস আগে বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে এক সভায় ওই বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান বাবু। সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদকসহ অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কেউ তার এই বক্তব্যে প্রতিবাদ করেননি বরং হাততালি দিয়ে সমর্থন করেছেন। আজকে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। তাই উপজেলা আওয়ামী লীগ সাংবাদিক নাদিম হত্যার দায় এড়াতে পারে না।’
অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহীনা বেগম বলেন, ‘চেয়ারম্যান বাবু অনেক খারাপ প্রকৃতির লোক ছিলেন। আমরা তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি।’
তাহলে তিনি কীভাবে পদ-পদবি পেলেন জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি ছয় মাস হলো উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব পেয়েছি, এর আগে ২০ বছর যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা এ বিষয়ে বলতে পারবেন।’
এলাকার অনেকে বলছেন আপনিও এই ঘটনায় জড়িত এমন প্রশ্নের জবাবে শাহীনা বেগম বলেন, ‘আমি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই, আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’
ভাইরাল অডিও ক্লিপের বিষয়ে জানতে চাইলে বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, ‘আজই এ ধরনের অডিও ফেসবুকে দেখেছি, ওই বক্তব্য শুনেছি। তবে এ বিষয়ে এর আগে কেউ কোনও অভিযোগ করেনি। এমনটি আমাদের জানা ছিল না। নাদিম হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ১৩ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান বাবু পাঁচ দিনের রিমান্ডে আছেন। আশা করছি, ঘটনায় যারা যারা জড়িত, সবাই ধরা পড়বেন।’
সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানি নাদিম গত ১৪ জুন রাত ১০টার দিকে বকশীগঞ্জ বাজারের পাটহাটি এলাকায় সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল আলম বাবুর সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলার শিকার হন। পরদিন (১৫ জুন) বিকাল পৌনে ৩টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত শেষে রাত ১০টায় তার মরদেহ পৌর শহরের বাসায় এসে পৌঁছায়। পরে ১৬ জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার গ্রামের বাড়ি নিলাক্ষিয়া ইউনিয়নের গুমেরচরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে, সাংবাদিক নাদিম হত্যা মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মঙ্গলবার জামালপুর ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত শনিবার দুপুরে নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহারে মাহমুদুল আলম, তার ছেলে রিফাতসহ ২২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়।
ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রধান আসামি মাহমুদুলসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। গত রবিবার তাদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।