ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রাখার জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে মাত্র তিনটি স্থান। ফ্রিজিং গাড়ির জন্য রয়েছে আরও দুটি স্থান। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সেই নির্দেশনা যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ। জরুরি বিভাগের সামনেসহ পুরো হাসপাতাল ক্যাম্পাসজুড়ে এখন অবস্থান করছে শতাধিক বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স।
১৮ আগস্ট দুপুরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত স্থানের বাইরে সারি সারি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার জট। ফলে জরুরি বিভাগে রোগী নিয়ে প্রবেশ করতেও তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
রোগীর স্বজনদের ক্ষোভ
তারাকান্দা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জরুরি বিভাগের সামনে শত শত অ্যাম্বুলেন্স। পাশাপাশি রয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার বিশৃঙ্খল অবস্থা। এ কারণে জরুরি বিভাগে রোগী নিয়ে ঢুকতে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট দেরি হয়ে যায়। আমার স্ট্রোক করা বড় ভাইকে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু এই সমস্যার কারণে রোগীকে নিয়ে ডাক্তার পর্যন্ত পৌঁছতে ২০ মিনিট সময় লেগে গেছে। অথচ আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের তেমন কোনও তৎপরতা দেখা যায়নি। তারা চালকদের কোনও বাধা দিচ্ছেন না।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের সামনে সবসময় সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স। রোগী পরিবহনে চাহিদা যতটা, তার চেয়ে অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু রোগী পেলেই ভাড়া হাঁকা হয় অনেক বেশি। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্স না নিয়ে অন্য কোথাও থেকে কম টাকায় ভাড়া করবেন, সে সুযোগ নেই। হাসপাতালকেন্দ্রিক ‘অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট’ রোগীকে বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে তুলতেই দেবে না। তাদের এক কথা, অন্য অ্যাম্বুলেন্স নিতে হলে তাদের টাকা দিতে হবে। দূর থেকে মনে হবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড। হাসপাতালকে কেন্দ্র করে অ্যাম্বুলেন্সের মতো একটি জরুরি পরিবহনসেবাকে ঘিরে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে মাসের পর মাস। সব জেনেও কোনও ব্যবস্থা নেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা জেলা অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা। এগুলো একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ আছে দীর্ঘদিনের।
কর্মচারীরাও পড়ছেন ভোগান্তিতে
হাসপাতালের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইদানিং জরুরি বিভাগের সামনের অবস্থা খুব খারাপ। দিনে-রাতে শত শত অ্যাম্বুলেন্সসহ অন্যান্য যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সাধারণ রোগী তো দূরের কথা আমরা কর্মচারীরাও ঠিকমতো হাসপাতালে ঢুকতে পারি না। অথচ এই পরিস্থিতি দূর করতে লাখ লাখ টাকা খরচ করা হচ্ছে আনসারদের পেছনে। কিন্তু কোনও কাজ হচ্ছে না।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী, জরুরি বিভাগের সামনে নির্ধারিত স্থানের বাইরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রাখার কথা নয়। তবে চালকদের দাবি, হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্স রাখার সুযোগ না থাকায় তারা ক্যাম্পাসের ভেতরেই গাড়ি রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
অ্যাম্বুলেন্স চালক শরিফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাইনবোর্ডের মাধ্যমে নির্দেশনা দিলেও বাইরে আমরা অ্যাম্বুলেন্স রাখতে পারি না। এ কারণে হাসপাতালের ভেতরে রাখতে হচ্ছে। তবে রোগী ও স্বজনদের কিছুটা সমস্যা তো হচ্ছেই। এখানে না রাখলে কোথায় গাড়ি রাখবো আমরা।’
১১২ আনসার সদস্য, মাসে ব্যয় ২০ লাখের বেশি
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে ১১২ জন আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব আনসার সদস্যের পেছনে প্রতি মাসে ২০ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হচ্ছে।
তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহনের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের আনসার ক্যাম্পের পিসি খায়রুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্যরা সাধ্যমতো দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছেন। তবে জরুরি বিভাগের অ্যাম্বুলেন্স চালকরা কারও কথা শুনতে চায় না। তারা নির্দেশনা অমান্য করে অ্যাম্বুলেন্স রাখছেন।’
টহল জোরদার করা হবে
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি কয়েকদিন অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিতে ছিলাম। এ সময় টহল কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে অ্যাম্বুলেন্স চালকরা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তবে আমি যোগদান করেছি। এখন টহল জোরদার করা হবে এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দূর করা হবে। ওখানে কাউকে গাড়ি রাখতে দেওয়া হবে না।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, আনসার সদস্যদের দায়িত্ব এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকদের অবস্থানের মধ্যেও জরুরি বিভাগের সামনে বিশৃঙ্খলা কমছে না। ফলে জীবন বাঁচাতে হাসপাতালে আসা রোগীদেরই যদি জরুরি বিভাগে পৌঁছাতে ১৫-২০ মিনিট অতিরিক্ত সময় পার করতে হয়, তাহলে এই যানজট ও অব্যবস্থাপনা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।