জামালপুর শহরের পশ্চিম নয়াপাড়া রেলগেট সংলগ্ন একটি ভবনের পাঁচতলার তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট থেকে দুদিন আগে এক গৃহবধূর (৩০) মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ওই সময় ফ্ল্যাটের অন্য একটি কক্ষে থাকা তার দুই শিশুসন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। দুদিনের মাথায় সেই ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সেইসঙ্গে এ ঘটনায় কাউসার আহমেদ খান নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানিয়েছে, ‘গোপন সম্পর্কের’ টানাপোড়েন, টাকা দাবি এবং ব্ল্যাকমেইল কেন্দ্র করে ওই নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছিলেন কাউসার।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় জামালপুর শহরের জিয়া কলেজ মোড় এলাকায় পিবিআই কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত। গ্রেফতার কাউসার আহমেদ (৩২) জামালপুর সদর উপজেলার বাগেরহাটা এলাকার মৃত রফিক খানের ছেলে।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার জানান, গত রবিবার (২৩ আগস্ট) সকালে পশ্চিম নয়াপাড়া রেলগেট সংলগ্ন বাবুল মিয়ার বিল্ডিংয়ের পাঁচতলার ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে ওই নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পিবিআই জামালপুরের ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে ছায়াতদন্ত শুরু করে। এ ঘটনায় ওই নারীর মা বাদী হয়ে কাউসার আহমেদসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুজনের বিরুদ্ধে জামালপুর সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ পরিদর্শক রুপন কুমার সরকারকে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গতকাল সোমবার বিকালে জামালপুর সদর উপজেলার বাগেরহাটা এলাকা থেকে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি কাউসার আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। পিবিআইয়ের তদন্তে ও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ২০১৪ সালে ওই নারীর সঙ্গে মো. শাওন নামের এক ব্যক্তির বিয়ে হয়েছিল। তাদের সংসারে দুই ছেলেসন্তান আছে। ২০২১ সালে শাওন মারা গেলে দুই সন্তান নিয়ে জামালপুর শহরের একটি বাসায় বসবাস করতে থাকেন ওই নারী।’
তদন্ত ও আসামির জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার জানান, প্রায় তিন বছর আগে কাউসার আহমেদের রাফি স্টোরে কেনাকাটার সূত্রে ওই নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে বকেয়া টাকা পরিশোধের কথা বলে কাউসারকে বাসায় ডেকে নেন। সেখানে তাদের শারীরিক সম্পর্ক হয় এবং সেটির গোপনে ভিডিও ধারণ করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন কাউসার। ওই ভিডিও দিয়ে কাউসারকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায় করা হতো। একপর্যায়ে কাউসার তার সঞ্চিত অর্থের পাশাপাশি জমি এবং মা ও স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির অর্থও ওই নারীর পেছনে ব্যয় করেন বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। এ ছাড়া কাউসারকে ইয়াবা সেবনে আসক্ত করার চেষ্টা করতেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলার জন্য কাউসারকে চাপ দিতেন বলে জবানবন্দিতে জানান। এসব বিষয় নিয়ে একপর্যায়ে তাদের গোপন সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন কাউসারকে বাসায় ডেকে টাকা দাবি করেন ওই নারী। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে কাউসারের স্ত্রীকে ফোন করে তাদের সম্পর্কের কথা জানিয়ে দেন এবং কাউসার তার সঙ্গে আছেন বলে জানান। স্ত্রীকে ফোনে এসব কথা বলা নিয়ে কাউসারের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে কাউসার তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। গ্রেফতারের পর কাউসারকে আদালতে পাঠানো হয়। সেখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।’
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত বলেন, ‘ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক। তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত ও আসামির জবানবন্দি পর্যালোচনা করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত নিরপেক্ষ ও আইনানুগভাবে সম্পন্ন করে দ্রুত আদালতে প্রতিবেদন দেবে পিবিআই।’