এখনও সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়নি বগুড়ার নওয়াব প্যালেসের

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ থাকার পরও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর স্মৃতি বিজড়িত বগুড়ার নওয়াব প্যালেসের সংরক্ষণের কাজ এখনও শুরু হয়নি।  এ সুযোগে প্রভাবশালী মহল রবিবার (৮ মে) রাতে প্যালেসের সামনে থাকা সাইনবোর্ড ঢেকে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব থাকায় গত ১৯ এপ্রিল সিনিয়র সহকারী সচিব ছানিয়া আক্তার প্যালেসটি সংরক্ষণে প্রথমে বিজ্ঞপ্তি জারি এবং পরে গেজেট আকারে প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠি ৫ মে জেলা প্রশাসকের দফতরে পৌঁছেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন: পাবনায় লোডশেডিং: ইরি-বোরো খেতে সেচ সংকট, জনজীবন দুর্বিষহ

বগুড়া শহরের সুত্রাপুর মৌজার ১৭০৮ নম্বর দাগে তিন একর ৭৫ শতক বা প্রায় ১০ বিঘা জমিতে নওয়াব প্যালেস ও অন্যান্য স্থাপনা ছিল। ১৮৮৪ সালে প্যালেসটি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার অনেক পরে মোহাম্মদ আলীর ওয়ারিশরা এক একর ৫৮ শতক বাদে অবশিষ্ট জমি বিক্রি করে দেন। সেখানে আল-আমিন কমপ্লেক্স, টিএমএসএস মহিলা মার্কেট, শরিফউদ্দিন সুপার মার্কেট, র‌্যাংগস গ্রুপ, বহুতল রানা প্লাজা গড়ে তোলা হয়।

মোহাম্মদ আলী ও তার প্রথম স্ত্রী হামিদা বানুর কবর বাদে প্যালেসের ১.৫৫ একর জমির উপর বগুড়ার কয়েকজন ‘নব্যধনীর’ নজর পড়ে। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে তারা এ সম্পদ দখলের চেষ্টা করছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে সংস্কৃতিকর্মী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলন শুরু করেন। সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদফতর যখন প্যালেসটি পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণে চিঠি বিনিময় করছিল, ঠিক তখন তিন ব্যবসায়ী গোপনে প্যালেসটি ক্রয় করেন।

মোহাম্মদ আলীর প্রথম স্ত্রীর দুই ছেলে সৈয়দ হামদে আলী চৌধুরী ও সৈয়দ হাম্মাদ আলী চৌধুরী গত ১৫ এপ্রিল ছুটির দিন ঢাকায় বসে কমিশনের মাধ্যমে দলিলে সই করেন। ১৭ এপ্রিল বগুড়া রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল (নং-৪৩১৮) সম্পাদন হয়। দলিলে এ সম্পদের মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ২৭ কোটি ৪৫ লাখ ৭ হাজার টাকা। যৌথভাবে কিনেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব মমতাজ উদ্দিনের বড় ছেলে ও বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাছুদুর রহমান মিলন, চেম্বারের সহ-সভাপতি ও হাসান গ্রুপের স্বত্ত্বাধিকারী এটিএম শফিকুল হাসান জুয়েল এবং চেম্বারের সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল গফুর।

আরও পড়ুন: খুলনা-যশোর শিল্পাঞ্চল আবার উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা

এদিকে নওয়াব প্যালেসের বিক্রির খবরটি জানাজানি হলে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকগুলোয় রিপোর্ট করা হয়। পাশাপাশি সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ মানববন্ধন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান এবং লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বিক্রির আগে গত ৯ মার্চ প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল। মন্ত্রণালয় অবহিত হওয়ার পর নওয়াব প্যালেসকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালককে সরকারি মুদ্রণালয়ে যোগাযোগ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং বিজ্ঞপ্তির গেজেট কপি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণে অনুরোধ করা হয়। অনুলিপি দেওয়া হয় সংস্কৃতিক মন্ত্রীর একান্ত সচিব, বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও সচিবের একান্ত সচিবকে।

গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় রবিবার রাতে ক্রেতারা নওয়াব প্যালেসের সাইনবোর্ড ঢেকে দিয়ে সেখানে ক্রয় সূত্রে এ সম্পত্তির তিন মালিকের নাম লেখা হয়েছে। সোমবার সকালে এ দৃশ্য দেখে সচেতন বগুড়াবাসীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আশরাফ উদ্দিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) আরাফাত রহমান জানান, নওয়াব প্যালেস সংরক্ষণ করা হলেও আগে অধিগ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে ক্রেতা বা মালিকদের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, অধিদফতর থেকে গেজেট হওয়ার পর নির্দেশ এলে বগুড়া নওয়াব প্যালেস পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

/এসটি/ এপিএইচ/