মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় স্থানীয় আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের যৌথ আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘চাঁপাই আমের বিলেত যাত্রা’ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ পরিচালক মো. সাজদার রহমান, আম গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হামিম রেজা, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন, স্থানীয় আমচাষিরাসহ প্রমুখ।
জানা গেছে, চলতিবছর ৮৫ টাকা কেজি দামে স্থানীয় আমচাষিদের কাছে থেকে ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ প্রযুক্তির আম সংগ্রহ করে বিলেতে পাঠাচ্ছে মের্সাস সোনারগাঁও ইন্টারন্যাশনাল, এম এ জিন্নাহ এন্টারপ্রাইজ ও মের্সাস মরিসুন এন্টারপ্রাইজ। তারা জানায়, রফতানির জন্য ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদনকারী ২০ জন কৃষককে বাছাই করা হয়েছে। আর আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর যৌথভাবে বাগান পরিদর্শন করে এসব কৃষকদের নির্বাচন করেছেন।
এদিকে, ফল গবেষকরা জানিয়েছেন, গত বছরের মতো এবারও বিদেশে রফতানির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের সুমিষ্ট আম। গত বছর বিশ্বখ্যাত চেইনসপ ওয়ালমার্টের মাধ্যমে শুধু ইংল্যান্ডে রফতানি হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম। এবার শুধু ইংল্যান্ড নয়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আম রফতানির সম্ভাবনার কথাও জানালেন ফল বিজ্ঞানীরা।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির গবেষক ড. মো. শরফ উদ্দিন জানান, বিদেশে রফতানির জন্য এখন পুরোপুরি প্রস্তুত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম। রোগবালাই ও পোকার আক্রমন থেকে রক্ষা ও বিষমুক্ত আম উৎপাদনে গত বছর বাণিজ্যিকভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয় ‘ফ্রুট ব্যাগিং’। আর এ প্রযুক্তিতে উৎপাদিত আম রফতানিযোগ্য হওয়ায় আমদানিতে আগ্রহ দেখায় বিশ্বখ্যাত কোম্পানি ওয়ালমার্ট। তখন প্রথমবারের মত চাঁপাইয়ের আম রফতানি হয় বিলেতের বাজারে। আর গত বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিদেশে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনে এবার ব্যাপক সাড়া পড়ে স্থানীয় আমচাষিদের মাঝে। জেলার আম বাগানগুলোতে আগাম জাতের খিরসাপাত/হিমসাগর, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগের পর এখন পুরোদমে চলছে নাবী জাতের ফজলি ও আশ্বিনা আমের ফ্রুট ব্যাগিং।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হামিম রেজা জানান, আম গবেষণা কেন্দ্রে দু’বছর ধরে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি প্রায় ১৮ জাতের আমের ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। শেষে ব্যাপক সফলতা পাওয়ায় গত বছর তা আমচাষিদের জন্য বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, সাধারণত একটি আম গাছে বিভিন্ন ধরনের যেসব কীটনাশক স্প্রে করা হয় তার খরচ থেকে এ প্রযুক্তি ব্যবহার অনেক সাশ্রয়ী। এছাড়া, মানসম্পন্ন নিরাপদ, শতভাগ রোগ ও পোকামুক্ত আম উৎপাদন সম্ভব এবং এ আম সংগ্রহের পর ১০-১৫ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করে তা খাওয়া যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. সাজদার রহমান বলেন, এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম যেমন বিষমুক্ত, তেমনি এতে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। দেশের মানুষ কার্বাইড, ফরমালিন আতঙ্কে যখন মৌসুমি ফল খাওয়া থেকে বিরত ছিল এবং বাজারে সাধারণ আমের দাম খুব হতাশাজনক, ঠিক সে সময় এই প্রযুক্তি আমচাষিদের আলোর মুখ দেখিয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ প্রযুক্তিটি সব আমচাষিদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হলে ক্ষতিকারক রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হবে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বিদেশের বাজারে রফতানির ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।
এ বছর দেশীয় সুপার মাকের্টের পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন আম বিদেশে রফতানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন চাষিরা এমনটাই জানালেন প্রযুক্তির গবেষক ড. মো. শরফ উদ্দিন। তিনি বলেন, রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনে এরই মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন বাগানের প্রায় ২৫ লাখ আমকে ব্যাগিং করা হয়েছে। আর ব্যাগিং প্রযুক্তিতে উৎপাদিত আম পুরোটাই রফতানিযোগ্য।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের মাঝপাড়া এলাকার আম ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, তিনি এবছর ৭০ হাজার আমে ব্যাগ পরিয়েছেন। গত বছর যারা এ পদ্ধতিতে আম চাষে করে লাভবান হয়েছিলেন, তাদের দেখেই এ বছর জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই আম চাষিরা ব্যাগিং করেছেন। এখন শুধু দরকার সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
এই ফ্রুট ব্যাগের সরবরাহকারী মেসার্স কাজী ট্রের্ডাসের স্বত্বাধিকারী কাজী সেতাউর রহমান জানান, এ বছর ৭ থেকে ৮ লাখ আম ব্যাগিং করা হয়েছে। বিদেশে রফতানির জন্য এখন পুরোপুরি প্রস্তুত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম। তারা আশা প্রকাশ করেন, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতির মাধ্যমে আগামীতে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম রফতানি করা সম্ভব হবে।
আরও পড়তে পারেন: জয়ের বক্তব্য না নিয়ে সংবাদ প্রচার: বিবিসির দুঃখ প্রকাশ
/এমও/এমএনএইচ/