মুক্তিযোদ্ধা সনদ জালকারীদের হোতা ‘কমান্ডার’ শহীদুর রেজা


শহীদুর-রেজাভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে শিক্ষানবিশ কনস্টেবল পদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে সোমবার পাবনা থেকে গ্রেফতার হয়েছেন ১৯ জন পুলিশ সদস্য। দুদক  ওই কনস্টেবলদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও সনদ জালকারী চক্রের মূল হোতা সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার চরচালা গ্রামের সোনালী ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও বরখাস্ত হওয়া বেলকুচির মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিটের বিতর্কিত কমান্ডার শহীদুর রেজা এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
এদিকে পুলিশ সদস্যরা গ্রেফতারের পর স্বজনরা আলোচিত রেজার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তারা সিরাজগঞ্জের বেলকুচির সেই আলোচিত রেজার নাম ফাঁস করছেন । গ্রেফতারকৃতদের ভুয়া ও জাল সনদ দিয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে ভাতা দেওয়া এবং তাদের ছেলে-মেয়েদের সরকারি চাকরির সুযোগ করে দিয়ে  গত কয়েক বছরে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত রেজার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তের আগেও জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ড ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কয়েক দফা তদন্ত হয়েছে।
ওইসব তদন্তে রেজাকে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করা হলেও বিশেষ প্রভাবে তিনি বার বার বেঁচে যাচ্ছেন বলেও এলাকায় গুঞ্জণ রয়েছে। এমনকি, জেলা মুক্তিযুদ্ধ ইউনিট কমান্ড থেকে রেজাকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর সহকর্মী ডেপুটি কমান্ডার নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও জেলা ইউনিট কমান্ডের কর্মকর্তাদের নানা চাপ সইতে হচ্ছে। আর এ কারণেই রেজা ও তার সহযোগীরা এখনও বহাল তবিয়তেই রয়েছেন।

এদিকে মঙ্গলবার বেলকুচির চরচালা গ্রামে রেজার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, ১৯ কনস্টেবল গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা মিডিয়ায় প্রকাশের পর তিনি মোবাইল বন্ধ রেখে সোমবার দুপুর থেকে গা-ঢাকা দেন।

বেলকুচি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার নজরুল ইসলাম জানান, যুদ্ধকালীন পিস কমিটির সদস্য মানবতাবিরোধী বেলকুচির সমেশরপুর গ্রামের শহীদুর রেজা আসলেই মুক্তিযোদ্ধা কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বেলকুচিতে সে একটানা ২৭-২৮ বছর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। কমান্ডার থাকাকালীন অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া ও জাল সনদ দিয়ে সরকারি চাকরির সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তিনি। সোনালী ব্যাংক, বেলকুচি সোহাগপুর শাখায় শাখা কর্মকর্তার পদে থাকাকালীন ব্যাংকের টাকা তছরুপ করায় সে এখনও পেনশন পাচ্ছে না। তারপরেও সে ৩ তলা বাড়ির মালিক। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সরকারি বরাদ্দও নয়ছয় করায় তার বিরুদ্ধে জেলা ইউনিট কমান্ড, কেন্দ্রীয় কমান্ডসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা কয়েক দফা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বেলকুচি ও সদর উপজেলার অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ দিয়ে ২০১২ এবং ২০১৪ সালে ১৯-২০ জন পুলিশ বিভাগে কনস্টেবল চাকরি দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ আছে। রেজার ছেলে ডা. শুভও সার্টিফিকেট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।

জেলা মুক্তিযোদ্ধার ইউনিট কমান্ডের সহকারি ইউনিট কমান্ডার (দফতর) গাজী আব্দুর রহমান জামিল বলেন, শহীদুর রেজা শতভাগ দূর্নীতিগ্রস্ত। তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা ইউনিট কমান্ড থেকে তদন্ত হয়েছে। সে অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে আমাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের অপরাধে তার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন ও বিচার বিভাগ থেকেও দু’দফা তদন্ত হয়েছে।

জেলা ইউনিট কমান্ডার গাজী সফিকুল ইসলাম সফি বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দূর্নীতি ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের নির্দেশে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।   

সাবেক মৎস্য ও প্রাণী সম্পদমন্ত্রী জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ বিশ্বাস বলেন, মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ নিয়ে চাকরি করতে গিয়ে গ্রেফতারকৃত কনস্টেবলদের বাড়ি অধিকাংশই  বেলকুচিতে। তাদের স্বজনরা রেজার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে অভিযোগ দিচ্ছে। কিন্তু, রেজাকে পাওয়া যাচ্ছে না।          

দুদক পাবনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, সার্টিফিকেট বাণিজ্যের মূল হোতা শহীদুর রেজাকে খুঁজছে পুলিশ। তাকে ধরতে পারলেই তদন্ত অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। 

উল্লেখ্য, সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টায় দুদক কার্যালয়ের অদূরে চাঁদাখার বাঁশতলা থেকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদে পুলিশে চাকরি নেয়ায়র অভিযোগে পাবনা থেকে পুলিশের ১৯ কনস্টেবলকে আটক করে দুদক।

আরও পড়ুন: পণ্যজটে স্থবির বেনাপোল বন্দর, ক্রেন ও ফর্কলিফট অচল

/এআর/