বগুড়ায় পুঁজি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আড়াই হাজারের বেশি পোলট্রি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। যে কয়েকটি খামার চালু আছে, সেগুলোও চলছে কোনও রকমে। এতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ বেকার হয়ে গেছে।
খামারিরা জানান, গত বছরের ৪ এপ্রিল প্রলয়ংকারি ঝড়ে ৪০ শতাংশ খামার ধ্বংস হয়ে গেছে। পুঁজির অভাবে অনেকগুলো থামার বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দিলেও ১২-১৭ শতাংশ সুদ দিতে হয় যা পরিশোধ করা কঠিন।
বগুড়া জেলা পোলট্রি অনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, পোলট্রি ব্যবসায় ৭০ শতাংশ ব্যয় হয় ফিডে। কিন্তু এ ফিড মানসম্পন্ন ও জীবানুমুক্ত না হওয়ায় মাংস ও ডিম উৎপাদনের হার দিন দিন কমছে। মাংসের জন্য ব্রয়লার ও সোনালী জাতের মুরগি এবং ডিমের জন্য লাল রঙের হাইব্রিড ও সোনালী হ্যাচিং (ব্রিডিং) মুরগি পালন করা হয়। একটি সুস্থ মুরগি একদিন পর পর ডিম দিয়ে থাকে। এ ডিম থেকে একদিনের সোনালী জাতের বাচ্চা হয়। একটি বাচ্চা উৎপাদনে ডিম ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে ১৩ টাকা খরচ হয়। বছরের অধিকাংশ সময় প্রতি পিস বাচ্চা ১১-১২ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রতি পিস বাচ্চা লোকসান দিয়ে ১২ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। তবে আগস্ট মাসের শুরু থেকে প্রতি পিস বাচ্চা ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে খামারিরা কিছুটা হলেও লাভের মুখ দেখছেন। সোনালী জাতের একটি বাচ্চা ৭৫-৮০ দিন লালন-পালন করে ৮০০ গ্রাম ওজন হয়। এ সময় খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি মুরগির উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ১৮০ টাকা। অথচ বর্তমানে প্রতি কেজি বিক্রি করতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। একটি খামারে বছরে ৬-৭ বার বাচ্চা থেকে মাংসের জন্য মুরগি উৎপাদন হয়ে থাকে। এর মধ্যে ৩-৪ বার মালিকদের লোকসান গুণতে হয়। অথচ ভোক্তাদের কাছে এ মুরগি পৌঁছাতে মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা কেজিতে ৪০-৫০ টাকা লাভ করেন।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক খামারিদের একটি সূত্র জানায়, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিমাত্রায় মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করে মাত্র ৩০-৩৫ দিনে এক কেজি ওজনের মুরগি তৈরি করছে। খাবার খরচ কমে যাওয়ায় ওইসব খামারিরা মোটা অংকের লাভবান হচ্ছেন।
বগুড়া পোলট্রি অনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমীন লিডার জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই এ জেলায় ৫ হাজারের বেশি পোলট্রি ও ৬০টি হ্যাচারি গড়ে উঠে। ব্যাংক ঋণ না দেয়া, পুঁজি না থাকা ও প্রকৃতিক দুর্যোগে অর্ধেক বন্ধ হয়ে গেছে। লোকবলের অভাবের অজুহাতে প্রাণী সম্পদ বিভাগের কোনও মনিটরিং নেই। ওই বিভাগ থেকে রানীক্ষেত রোগের ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা থাকলেও চাহিদামত দিতে পারেনা। বর্তমানে খামারিরা একদিনের বাচ্চায় কিছু লাভবান হলেও মাংসের মুরগি বিক্রি করে লোকসান গুণছেন। তারা পুঁজি হারালেও মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, এ খাতের উন্নতির জন্য খাদ্য এবং ওষধের মান নিয়ন্ত্রণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে এন্টিবায়োটিকমুক্ত মুরগি ও ডিম বিদেশে রফতানির উদ্যোগ নিতে হবে।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আ.ফ.ম. শফিউজ্জামান বলেন, আমাদের হিসাব অনুযায়ী সরকারি একটি ও বেসরকারি তিন হাজার ৪৭৬টি পোলট্রি খামার ও ৫২টি হ্যাচারি রয়েছে। এসব খামার ও হ্যাচারিতে সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং সরকারি নির্ধারিতমূল্যে ভ্যাকসিন সরবরাহ দিয়ে থাকেন। এছাড়া পরামর্শ প্রদানসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হয়।
ভুক্তভোগী খামারিরা এ খাতকে আবারও চাঙ্গা করতে স্বল্প সুদে ঋণ, মুরগি ও ডিম বিদেশে রফতানীর সুযোগ এবং সরকারি প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দাবি করেছেন।
/এমডিপি/আপ-এআরএল/