১০ টাকা কেজি চালের মামলার তদন্ত: আগ্রহী দুদক, বিব্রত পুলিশ

সিরাজগঞ্জদুস্থদের জন্য ১০ টাকা কেজির ৬৫ বস্তা চাল জব্দের মামলার তদন্ত নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিরাজগঞ্জ সদর থানা পুলিশের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। এই ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি ও ডিলারসহ স্থানীয় প্রভাবশালী কালোবাজারি চক্র জড়িত থাকার সন্দেহে মামলাটির তদন্তভার নিতে আগ্রহী দুদক। এরইমধ্যে মামলার এজাহারে সন্দেহভাজন আসামিদের নাম সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি বলেও দুদক যে প্রশ্ন তুলেছে তাতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে পুলিশ।

দুদক সিরাজগঞ্জ-পাবনা অঞ্চলের উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিকী কালোবাজারে ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রির এই মামলার ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।  অপরদিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা মামলাটি হস্তান্তরের বিষয়ে আদালত ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে সদর থানা পুলিশ। চাল জব্দ হওয়ার ঘটনায় বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ ও তার স্ত্রী রাজাপুর ইউপি চেয়ারম্যান বেগম সেনিয়া সবুরের নাম আসার কারণেই দুদক ও পুলিশের মধ্যে এ ধরনের টানাপড়েন শুরু হয়েছে বলে বিশেষ সূত্রে জানা গেছে। বেলকুচির এই দুই জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট এলাকার ডিলারদের মামলার এজাহারে সরাসরি অভিযুক্ত না করে বরং তাদের বাঁচাতে সন্দেহভাজন আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দুদক। গ্রেফতারের পর তিন আসামির রিমান্ড মঞ্জুর না হওয়া ও সঠিকভাবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ না করার বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে পুলিশ।

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১ অক্টোবর বেলকুচির রাজাপুর ইউনিয়ন ও সদরের কড্ডার মোড় থেকে বেশ কয়েকজন ডিলারের মাধ্যমে দুস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত ১০ টাকা কেজির ৬৫ বস্তা চাল জেলা সদরে কালোবাজারে বিক্রির জন্য আনা হচ্ছিল। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক আলী জাফর, উপ-পরিদর্শক আলী জাহান ও সেকেন্ড অফিসার নুরুল ইসলাম ফোর্স নিয়ে এসব চাল জব্দ করেন। জেলা শহরের মিরপুর বাস টার্মিনাল সংলগ্ন ওয়াপদা বাঁধে অভিযান চালিয়ে দু’টি ট্রাকসহ সদর উপজেলার শিয়ালকোল গ্রামের রাকিব শেখ, শহরের হোসনপুর মহল্লা ট্রাক চালক সোহাগ ও খলিফাপাড়া মহল্লার আলমগীর হোসেনকে আটক করে পুলিশ।

আটক হওয়ার পর আটক তিনজনই পুলিশের কাছে প্রাথমিক স্বীকারোক্তিতে জানায়, বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ এবং তার স্ত্রী রাজাপুর ইউপি চেয়ারম্যান বেগম সনিয়া সবুর আকন্দ এবং কড্ডার মোড়ের ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ব্যবসায়ী আব্দুল করিম সরকারি এসব চাল রাকিব শেখের কাছে বিক্রি করেছে। এ ঘটনায় সদর থানার উপপরিদর্শক আবু জাফর বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ২৫(১). ২৫ (২) এবং ২৫ (ডি) ধারায় সিরাজগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেন। একই থানার উপ-পরিদর্শক আলী জাহান মামলাটির তদন্ত করছেন। কিন্তু এক মাস ৭ দিন পার হলেও ঢিলেঢালা তদন্ত কার্যক্রমের কারণে এ মামলার আর কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। মামলাটির এজাহারে সরকারি মালামাল আত্মসাতের ৪০৯ ধারা সম্পৃক্ত না করায় ইচ্ছে থাকলেও নতুন করে তদন্তভার নিতে পারছে না বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তারা।

দুদক সিরাজগঞ্জ-পাবনা অঞ্চলের উপপরিচালক (ডিডি) আবু বকর সিদ্দিকী বুধবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলাটি দুদকের আওতাধীন হলেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে মামলাটি হস্তান্তর করছে না পুলিশ। যেহেতু এ ঘটনার সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, ডিলার ও সরকারি কর্মকর্তারা জড়িত আছে বলে জানা গেছে, কিন্তু তাদেরকে সরাসরি আসামি করা হয়নি। উপরন্তু মামলাটির তদন্ত নিয়ে পুলিশের যথেষ্ট গড়িমশি রয়েছে।’

অন্যদিকে, মামলার বাদী উপপরিদর্শক আলী জাফর বলেন, ‘যেহেতু সরকারি এসব চাল কালোবাজারে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল, তাই ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(১). ২৫ (২) এবং ২৫ (ডি) ধারায় মামলাটি রজু করা হয়েছে। এ মামলায় আমাদের কোনও গড়িমশি নেই। ধারায় কোনও নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া নেই। তারপরেও আমরা যথেষ্ট আন্তরিক।’

সদর থানার ওসি হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘দুদক মামলার তদন্তভার নিতে চাইলে আমাদের কোনও অসুবিধা নেই। তার জন্য কোর্ট বা পুলিশ সুপার বরাবর তাদের আবেদন করা উচিত। আমরা নিজেরাই এ মামলাটি নিয়ে খুবই বিব্রত। ধৃত আসামির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী জনপ্রতিনিধি বা ডিলারদের সরাসরি আসামি করার সুযোগ না থাকায় তাদের এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা অভিযুক্ত হলে তদন্তে পার পাবে না কেউই। আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছি।’

বেলকুচি উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আকন্দ ও তার স্ত্রী রাজাপুর ইউপি চেয়ারম্যান বেগম সেনিয়া সবুর এর আগে দাবি করেছেন,  ১০ টাকা কেজির চাল বন্টন, বরাদ্দ বা কালোবাজারিতে বিক্রির সঙ্গে তারা কোনোভাবেই জড়িত নন।’

আরও পড়ুন- 


ইভ টিজিং: স্কুল-কলেজে আবারও সক্রিয় হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত

/এফএস/