জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ও কালাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আলু ক্ষেতে রোপণের দেড় মাসেও গজায়নি কোনও গাছ। মাঠের পর মাঠে জমির বেশিরভাগ অংশই গাছবিহীন অবস্থায় খালি পড়ে আছে। এতে কৃষকরা চলতি আলু মৌসুমে চরম ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। ক্ষতিগ্র কৃষকদের দাবি, স্থানীয় আলুবীজ ব্যবসায়ীরা এবার বীজ সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে হিমাগারে সাধারণভাবে সংরক্ষণ করা আলু বীজ হিসেবে সরবরাহ করেছে। যা তারা অধিক ফলনের আশায় উচ্চ মূল্যে ক্রয় করে রোপণ করেছেন। এ ব্যাপারে ক্ষেতলাল উপজেলার ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি বরাবরে অভিযোগ দায়ের করলেও কালাইয়ের কৃষকরা কোনও অভিযোগ করেননি।
সরেজমিনে মঙ্গলবার ক্ষেতলাল উপজেলার মাটিহাঁস গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম এর রোপণ করা মিউজিকা জাতের আলু ক্ষেতে গিয়ে দেখা গেছে জমিতে দু’একটি গাছ জন্মালেও পুরো ক্ষেতই প্রায় খালি পড়ে আছে। অথচ ক্ষেতলাল উপজেলার ময়ুম গ্রামের বীজ ব্যবসায়ী আলাল উদ্দিনের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকার মিউজিকা জাতের আলুবীজ কিনেছিলেন। যা তিনি দেড় মাস আগে তিন বিঘা জমিতে রোপণ করলেও ২৫ ভাগ গাছও জন্মায়নি। আলিম জানান এ পর্যন্ত ওই তিন বিঘা জমিতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মত। যা থেকে তিনি ১০ মন আলুও পাবেন না। তিনি ওই বীজ সংগ্রহ করেছেন ক্ষেতলালের ময়ুম গ্রামের বীজ বিক্রেতা আলাল উদ্দিনের কাছ থেকে। একই চিত্র দেখা গেছে ওই মাঠে রোপণ করা মাটিহাঁস গ্রামের একাব্বর আলী ও আলী মামুদপুর গ্রামের লিটন সহ ওই এলাকার ৬০-৭০ জন কৃষকের প্রায় একশ’ বিঘারও বেশি জমিতে।
মাটিহাঁস গ্রামের কৃষক আবু হাসান জানান,তার গ্রাম সহ আশপাশ এলাকার প্রায় ৫০-৬০ জন কৃষক কাঁচামাল বিক্রেতা আলাল উদ্দিনের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহের পর আলু রোপণ করে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এবার বীজের তীব্র সঙ্কটের কারণে কৃষকরা যে যেখানে বীজ পেয়েছেন সেখান থেকেই সংগ্রহ করেছেন। দাম আকাশ ছোঁয়া হলেও কেউ আপত্তি করেননি।
ময়ুম গ্রামের বীজ ব্যবসায়ী আলাল উদ্দিন বীজ সরবরাহের কথা স্বীকার করে বলেন, ওই কৃষকদের পাশাপাশি তিনি নিজেও ছয় বিঘা জমিতে মিউজিকা আলু চাষ করে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ থেকে ওই আলু তিনি কিনে এনে কৃষকদের কাছে বিক্রি করেছেন। এখন তার কিছুই করার নেই বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে কালাই উপজেলার বেগুনগ্রাম সহ আশপাশের কয়েকটি মাঠে সরেজমিনে দেখা গেছে একই চিত্র। উন্নত জাতের মিউজিকা আলুর পাশাপাশি তারা রোপণ করেছেন সেভেন্টি (স্থানীয় নাম) নামে নতুন জাতের আলু। বেগুনগ্রামের কৃষক তছলিম উদ্দিনের ২৮ বিঘার মধ্যে ২৬ বিঘা জমিতেই কোনও গাছ জন্মায়নি। একইভাবে ওই গ্রামের আকবর আলী, তুহিন, আতাউর, ছামাদুল ও জাহাঙ্গীর সহ ৪০-৫০জন কৃষক প্রায় একশ বিঘা জমিতে ওই দুই জাতের আলু চাষ করে প্রতারিত হয়েছেন। তারা ৪০ টাকা কেজি দরে মিউজিকা ও সাড়ে ৩৭ টাকা কেজিতে সেভেন্টি জাতের আলুবীজ স্থানীয় ঝামুটপুর গ্রামের বীজ বিক্রেতা সাহাদুল ইসলামের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জ এলাকা থেকে সংগ্রহ করেছেন।
কৃষক তছলিম উদ্দিনের ছেলে আব্দুর রশিদ জানান, তারা বীজ বিক্রেতা সাহাদুল ইসলামের মাধ্যমে গত বছর মিউজিকা ও সেভেন্টি জাতের আলু আগাম চাষ করে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন। এজন্য এবার এলাকার কৃষকরা ওই আলু চাষে বেশি আগ্রহী হয়। যার ফলে বেশি দাম দিয়ে বীজ সংগ্রহ করে আলু রোপণ করার পর প্রায় দেড় থেকে দুই মাস বয়স হলেও জমিতে কোন গাছ ওঠেনি।
স্থানীয় কৃষি বিভাগে অভিযোগ না করা প্রসঙ্গে ওই গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান বলেন, ‘অভিযোগ করে আর কি হবে। আমরা তো কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে বীজ ক্রয় করিনি। তাছাড়া শুনেছি ওই বীজ বিক্রেতা সরকার অনুমোদিত বীজ ডিলারও নয়। এজন্য নিয়তি মনে করে সবাই চুপচাপ আছি’।
ঝামুটপুর গ্রামের বীজ ব্যবসায়ী সাহাদুল ইসলামকে ফোন করা হলে ফোন তিনি রিসিভ না করায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, রোপণের দেড়মাস পর জমিতে গাছ না জন্মানোর বিষয়টি তাঁর জানা নেই। এ ব্যাপারে কোনও অভিযোগও পাওয়া যায়নি। যদি কোনও কৃষক বিএডিসির বীজ ডিলারের কাছ থেকে বীজ কিনে প্রতারিত হয়, অভিযোগ পাওয়া গেলে সে ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ক্ষেতলাল উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘মাটিহাঁস গ্রামের কৃষকরা আলুচাষ করে যে প্রতারণার শিকার হয়েছেন সে বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত চলছে। তদন্তের পর দোষীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
/এইচকে/