প্রত্যক্ষদর্শীরা ও পুলিশ জানায়, চার বছর আগে ৩ মার্চ রাত ২টার পর জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ায় যে, সরকার সাঈদীকে গোপনে ফাঁসি দিয়েছে ও তাকে চাঁদে দেখা যাচ্ছে। তারা মসজিদের মাইকে ও মোবাইল ফোনে এমন গুজব ছড়িয়ে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ, ধর্মভীরু জনগণকে ডেকে বের করে। ফজরের নামাজের পর লাঠিসোটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে জামায়াত ও বিএনপির শত শত সন্ত্রাসী মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাণিজ্য মেলা, স্টেশন, সদর থানা, ফুলবাড়ি, উপশহর, নারুলী, কৈগাড়ি ও স্টেডিয়াম ফাঁড়ি, মোকামতলা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। সদর থানার অস্ত্রাগার ও আশপাশের মার্কেটগুলোতে লুটপাটের চেষ্টা করা হয়।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মমতাজ উদ্দিনের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট, বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ, রাকসুর সাবেক ভিপি হায়দার আলীর বাড়ি ভাংচুর, দুপচাঁচিয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি বাড়িতে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ, শহরে এসএ পরিবহণের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, টাকা লুট, করতোয়া কুরিয়ার সার্ভিসে অগ্নিসংযাগ ও লুটপাট, সদর থানা ও শাজাহানপুর থানায় হামলা চালায়। তবে শাজাহানপুর থানা মাঝিরা সেনানিবাসের কাছে হওয়ায় ক্ষতি করতে পারেনি।
রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের হামলায় সবচাইতে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় নন্দীগ্রাম উপজেলায়। নন্দীগ্রাম থানা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসসহ ১৫টি অফিসে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়িতে আগুন দেয়। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল আশরাফ জিন্নাহর বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। শুধু এ উপজেলায় তাণ্ডবেই ১০ কোটি টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। বিভিন্ন স্থানে কাঠের গুঁড়ি, বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। বিআরটিসির বাস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সাবগ্রামে রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়। শাজাহানপুরের ফটকি সেতুর রেলিং ভেঙে ফেলা হয়।
হামলাকারীরা শহরের সাতমাথাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। জানমাল ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় গুলিবর্ষণ করলে নারীসহ হামলাকারীদের ১৩ জন নিহত হয়েছিল। সন্ত্রাসীদের হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শহর ও কয়েকটি উপজেলায় ১৪৪ ধারা জারি করেন।
এদিকে গত চার বছরে মামলাগুলো নিস্পত্তি না হওয়ায় জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি দলের কৌঁসুলি ও আইনজীবীরা অনেক আসামিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সাজিয়ে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করেছেন। সরকারি দলের নেতা ওইসব উকিলরা আর্থিকভাবে লাভবান হলেও মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বগুড়ার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুল মতিন জানান, গত ২০১৩ সালের ৩ মার্চের নাশকতায় ঘটনায় পুলিশ ও ক্ষতিগ্রস্তরা প্রায় ৯৪ হাজার জনের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ৫২টি মামলায় দুই সহস্রাধিক জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন। অবশিষ্ট মামলাগুলোর ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। মামলাগুলো জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আসামিদের প্রায় সবাই জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক। এদের অধিকাংশই গ্রেফতার হয়। তবে পরবর্তীদের অনেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। তিনি যে কোনও গাফিলতি অস্বীকার করে আরও জানান, ‘সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। শিগগিরই মামলাগুলোর নিস্পত্তি হবে।’
জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম মন্টু বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার ঘটনায় মামলা ও আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ায় চার্জশিট জমা দিতে দেরি হয়েছে। এ কারণে বিচার প্রক্রিয়ায়ও দেরি হচ্ছে।’ আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা দলীয় পরিচয় দেখিয়ে আসামিদের জামিন পাইয়ে দিচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জুনিয়র আইনজীবীরা এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারেন বলে আমরা জানতে পারি। সিনিয়রা কেউ এমন কিছু করেননি। পরে আমরা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেই এই আসামিদের পক্ষে আমরা দাঁড়াবো না।’
বগুড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাজমুল হুদা পপন বলেন, ‘২০১৩ সালের ৩ মার্চের ওই ঘটনা আমাদের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয়। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের নেতা-কর্মীদের হয়রান করতে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। অনেক নেতা ও তাদের পরিবার ঘরছাড়া হয়েছেন ও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আইনজীবী ফোরামের মাধ্যমে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করে আমরা তাদের সহায়তা দিচ্ছি।’ আওয়ামী লীগের কর্মী দেখিয়ে আসামিদের জামিন পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে বলতে পারছি না। তবে আমরা আমাদের মতো করে কাজ করে যাচ্ছি।’
/এফএস/
আরও পড়ুন-