গরিবের হিমাগার

Joypurhat Pic - 01দাম না পেয়ে আলু নিয়ে বিপাকে পড়া জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কৃষকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘প্রাকৃতিক আলু সংরক্ষণাগার’ যার স্থানীয়ভাবে নাম রাখা হয়েছে ‘গরিবের হিমাগার’। বাঁশ ও খড়ের ছাউনি দিয়ে অল্প খরচেই তৈরি করা যায় ‘প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগার’। যেখানে তিন থেকে চার মাস আলু থাকে নিরাপদ। স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে নির্মাণ করা এই আলু সংরক্ষণাগার ইতোমধ্যে আলু প্রধান এই এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

আলুর জন্য বিখ্যাত জয়পুরহাটের কৃষকরা এবার আলু চাষ করে চরম লোকসানে পড়েছেন। বাজার মূল্য অনুযায়ী জমি থেকে আলু বিক্রি করে এবার কৃষকরা বিঘা প্রতি লোকসান করেছেন পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। এ অবস্থায় বিত্তবান কৃষকরা আলু বিক্রি না করে স্থানীয় হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণ করলেও অর্থাভাবে প্রান্তিক কৃষকরা আলু সংরক্ষণ করতে পারছেন না। তাদের কথা বিবেচনা করে এবারই প্রথম স্বল্প খরচে আলু সংরক্ষণ করার ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা সোস্যাল এহেড অর্গানাইজেশন (এসো)। ইতোমধ্যে এ উদ্যোগ কাজে লাগিয়ে আলু সংরক্ষণ করে লাভবান হচ্ছেন এলাকার প্রান্তিক আলু চাষিরা। এসো’র পরামর্শ ও আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার তারাকুল গ্রামের মতিয়র রহমান, নিশ্চিন্তা গ্রামের আব্দুল মোমিন ও দেউলা গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান পৃথক তিনটি আলু সংরক্ষণাগার তৈরি করেছেন। মৌসুমের শুরুতে ২২০ টাকা মণ আলু বিক্রি না করে তারা এই সংরক্ষণাগারে আলু  সংরক্ষণ করে সেই আলু ৫৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে লাভবান হয়েছেন।

Joypurhat Pic - 02মাত্র এক শতক জায়গায় বাঁশ এবং খড়ের ছাউনি দিয়ে এই সংরক্ষণাগার তৈরি করতে প্রথমেই খরচ হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। পরবর্তীতে আর কোনও খরচ লাগে না। ১২ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই সংরক্ষণাগারে তিনটি পৃথক স্তরে আলু রাখা যায়। প্রতিটি সংরক্ষণাগারে  আলু রাখার ধারণ ক্ষমতা ১২০ থেকে ১৩০ মণ। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র আলু চাষিরা যাতে তাদের উৎপাদিত আলুর নায্য মূল্য পায় সেদিক বিবেচনা করেই এ ধরনের সংরক্ষণাগার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ক্ষেতলালের বড়তারা ইউনিয়নের তারাকুল গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মতিয়র রহমান জানান, প্রতি বছর তারা আলু চাষ করলেও মৌসুমের শুরুতে আমদানি বেশি থাকায় আলুর নায্য মূল্য না পেয়ে তাদের লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু এবার ‘প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগারে’ আলু রেখে তিনি বেশ লাভবান হয়েছেন। সংরক্ষণাগারে দুই মাস আলু রাখার পর দাম বেশি হলে তিনি আলু বিক্রি করেছেন। বাড়ির বাইরে একটি পরিত্যক্ত জায়গায় সামান্য খরচে তিনি এসো’র সহযোগিতা নিয়ে সংরক্ষণাগার তৈরি করে তাতে আলু রেখেছিলেন।

একই এলাকার নিশ্চিন্তা গ্রামের আব্দুল মোমিন জানান, বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করলে বেশি দিন রাখা যায় না। রং নষ্ট হয়ে পঁচে যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক সংরক্ষণাগারে আলু স্বাভাবিক থাকে। সংরক্ষণাগারের ওপরে খড়ের ছাউনি থাকায় তাপমাত্রাও স্বাভাবিক থাকে।

বেসরকারি সংস্থা এসো’র প্রকল্প সমন্বয়কারী কৃষিবিদ মোজাফ্ফর রহমান জানান, এলাকার ক্ষুদ্র আলু চাষিরা আলু চাষ করলেও তারা ঠিক মত দাম পান না। মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম সাধারণত কম হয়। এতে ক্ষুদ্র আলু চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত বেশি হয়। দুই মাস পর আবার দাম বেশি হয়। তাদের কথা বিবেচনা করেই এ ধরনের সংরক্ষণাগার তৈরিতে তারা সহযোগিতা করছেন।  

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে,চলতি মৌসুমে জেলার ৪২ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। যা থেকে এবার আলু উৎপাদন হয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৪৮৮ মেট্রিক টন। জেলার বিভিন্ন বাজারে গ্র্যানোলা জাতের প্রতি মণ আলু বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা এবং অ্যাস্টেরিক জাতের প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা দরে।

 /বিএল/