সরেজমিনে দেখা যায়, চারুকলা চত্বরে ভাস্কর্য রাখার জায়গা ঘিরে রাখতে কোনও প্রাচীর নেই। বিভিন্ন সময়ে তৈরি করা ভাস্কর্যগুলো সাজিয়ে রাখা হয়েছে একতলাবিশিষ্ট অবকাঠামোর (শ্রেণিকক্ষ) সামনে। সেখানে প্রবেশ করতে কোনও গেট লাগে না। চারুকলার প্রধান ভবনের ভেতর দিয়ে এবং ভবনের দক্ষিণ পাশের রাস্তা দিয়ে সরাসরি সেখানে যে কেউ প্রবেশ করতে পারবে। এছাড়া উত্তর দিক দিয়ে পুকুরের ওপর তৈরি করা বাঁশের সাঁকো দিয়ে এবং পূর্ব দিক দিয়েও সেখানে প্রবেশ করা যায়। সেখানে অরক্ষিত অবস্থায় দিনের পর দিন ভাস্কর্যগুলো রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে রাত পর্যন্ত কাজ করেন। আর রাতের বেলা চারুকলার অনুষদের প্রধান ভবনে দুইজন প্রহরী থাকেন।
মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) সকালে চারুকলা চত্বরে প্রায় তিন শতাধিক ভাস্কর্য উল্টানো দেখতে পেয়ে শিক্ষকদের খবর দেন বিভাগের কর্মচারীরা। এরপর এই ঘটনা নিয়ে ক্যাম্পাস জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। পরে প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে চারুকলা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইউসুফ আলী স্বাধীন ও ইমরান হোসাইন রনি সাংবাদিকদের সামনে এসে ভাস্কর্য উল্টানো দায় স্বীকার করেন। তারা বলেন, ‘আমাদের দাবি আদায় না হওয়ায় আমরা এভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছি। যাতে কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবি মেনে নেয়।’
দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ইমরান হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেখানে ভাস্কর্যগুলো রাখা হয়, সে জায়গার নিরাপত্তার জন্য সীমানা প্রাচীর, ভাস্কর্যগুলোর পরিচর্যা, চারুকলা গেটে পুলিশ চৌকি স্থাপন, সেশনজট দূর, শ্রেণিকক্ষ সংকট দূর করার দাবিতে আমরা এ কাজ করেছি। আমাদের সঙ্গে প্রায় সব ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এ প্রতিবাদে ছিল।’
তাদের এ দাবিগুলোর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। ছাত্র ইউনিয়নের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘চারুকলায় কতিপয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাস্কর্য সংরক্ষণের দাবিকে ছাত্র ইউনিয়নের রাবি সংসদ সংহতি প্রকাশ করে।’ তবে দাবি আদায়ে ভাস্কর্য উল্টানোর কৌশলের সমালোচনা করেন তারা।
এদিকে মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের দাবিকে যৌক্তিক মনে করছেন। মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুস ছালাম বলেন, ‘তারা যে সমস্যাগুলো সমাধানের দাবিগুলো করছে, আমরা যখন শিক্ষার্থী ছিলাম তখনও এই সমস্যা ছিল। দাবিগুলো অবশ্যই যৌক্তিক।’
একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কনক কুমার পাঠক বলেন, ‘এখানে সীমানা প্রচীরের বিষয়ে আমরা অনেক আগে থেকেই প্রশাসনকে জানিয়ে রেখেছি। বিভিন্ন সময় একাডেমিক কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে লিখিতভাবে প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।’
তবে অন্য কোনও উদ্দেশে বা কারও দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তারা যদি এই কাজ করে থাকে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের শাস্তি হওয়া উচিত বলেও মনে করেন এই দুই শিক্ষক।
আরেক শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক এ কে এম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনার অন্য কারও ইন্ধন বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিল কিনা তা জানার জন্য তদন্ত হওয়া জরুরি।’
এদিকে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরাও দাবি আদায়ের পদ্ধতির বিরোধিতা করলেও দাবিগুলো যৌক্তিক মনে করেন। মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অনুপম বলেন, ‘এখানে ভাস্কর্যগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়ে থাকে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সেশনজট-এই দাবিগুলোতে আমাদের সমর্থন থাকবে এটাই স্বাভাবিক।’ ভাস্কর্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের সুমন ও পেইন্টিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ফারিহাও দাবিগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
তবে মৃৎশিল্প বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোস্তফা শরীফ আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তাদের কিছু দাবি আছে যেগুলো যৌক্তিক। তবে তাদের দাবির পেছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে কিনা-সেটা দেখা দরকার। এ জন্য আমরা বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, প্রক্টর ও ডিন বরাবর একটি চিঠি দিয়েছি এবং তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছি।’
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল কিনা-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘লিখিতভাবে কোনও দাবি আমরা পাইনি। হঠাৎ করেই তারা এই ঘটনা ঘটায়।’
তবে কেউ কেউ মনে করছেন নিজেদের অপরাধ আড়াল করতেই পরবর্তীতে তারা এই দাবিগুলোকে সামনে নিয়ে আসছে।
নাট্যব্যক্তিত্ব ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, ‘দাবি হয়তো যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু দেশের এই পরিস্থিতিতে তারা যে পথ অবলম্বন করেছে তা কোনওভাবেই কাম্য নয়। এখন তাদের দাবি যৌক্তিক দেখতে গেলে তাদের অপরাধটা চাপা পড়ে যাবে। তাই আমি মনে করি এই ঘটনার তদন্ত হওয়া জরুরি।’
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,‘ভাস্কর্য উল্টানোর ঘটনার সঙ্গে কারও ইন্ধন আছে বলে আমি মনে করি না।’
রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু বলেন,‘তারা তাদের দাবি লিখিতভাবে প্রশাসনকে জানাতে পারতো কিন্তু সেটা না করেই ভাস্কর্য উল্টিয়ে রেখেছে, যা খুবই ন্যাক্কারজনক।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, ‘তাদের দাবিগুলো হয়তো যৌক্তিক। কিন্তু, তাদের দাবির সঙ্গে এই ঘটনার কোনও সংশ্লিষ্টতা আছে বলে আমার মনে হয় না। তারা অন্য কোনও উদ্দেশ্যে এটা করার পর অপরাধ ঢাকতেই পরবর্তীতে এই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছে।’
প্রসঙ্গত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় প্রায় তিন শতাধিক ভাস্কর্য উল্টিয়ে ফেলে মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভাস্কর্য বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইউসুফ আলী স্বাধীন ও ইমরান হোসাইন রনি সাংবাদিকদের কাছে এ কাজ করার কথা স্বীকার করেন। ওইদিন রাতেই তারা আবার ভাস্কর্যগুলো ঠিকঠাক করে রাখেন।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন থেকে তাদের বানানো এই ভাস্কর্যগুলো এখানে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এগুলোর পরিচর্যা নেওয়া হয় না। এছাড়া এই চত্বরে একটা প্রাচীর দেওয়ার জন্য তারা বিভিন্ন সময় শিক্ষকদের বলেছেন, কিন্তু এখানে কোনও প্রাচীর আজ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। প্রাচীর না থাকায় বাইরে থেকে আসা অনেকের দ্বারা শিক্ষার্থীদের বানানো এই ভাস্কর্যগুলো ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও অতীতেও ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতেই তারা এ কাজ করেছেন।
/এআর/এফএস/টিএন/
আরও পড়ুন-
উল্টানো ভাস্কর্য সাজিয়ে রাখলেন সেই শিক্ষার্থীরাই