চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শিবনগর এলাকার জঙ্গি আস্তানা বৃহস্পতিবার অভিযান চালায় আইনশঙ্খলা বাহিনী। অভিযান শুরুর আগে জানা যায়নি ঠিক কতজন ভেতরে আছে। অভিযান শুরু কিছু সময় পরই জঙ্গি আবু আলীর ছোট মেয়েকে সাজিদা আস্তানা থেকে বের হয়ে আসে। এরপর আবুর তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সুমাইয়া ওরফে রেখাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। আর অভিযানের সময় তাদের বড় মেয়ে নুরাইয়া ওরফে নুরি নানি বাড়িতে ছিল। বাড়িতে থাকা শিশুটিকে জীবীত উদ্ধারের আগে স্থানীয়রা শঙ্কায় ছিলেন তাকে নিয়ে। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কেন সন্তানের কথা চিন্তা করে না জঙ্গিরা।
স্থানীয়রা জানান, জঙ্গি আস্তানা শনাক্ত করার আগের দিনও (মঙ্গলবার) সাজিদা ও নুরি তাদের দাদা-দাদির বাড়িতে ছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবু তার দুই মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসে। পরের দিন নুরি তার নানা বাড়িতে যায়। এর মধ্যে বুধবার থেকে আস্তানাটি ঘিরে রাখে। অভিযান শুরু পর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকা স্থানীয়রা বলেন, ‘আবুরা জঙ্গি হয়েছে। কিন্তু অবুঝ শিশুদের অপরাধ কী? অথচ বাবা-মায়ের জন্য তাদেরও বোমা-গুলির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।’
বৃহস্পতিবার (২৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় অভিযান শেষ করে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি খুরশিদ হোসেন বলেছিলেন, ‘জঙ্গি আস্তানায় একজন নারী ও শিশুকে জীবিত উদ্ধারের জন্য এই অভিযান শেষ করতে সময় একটু বেশি লেগেছে। তবে অভিযান সফল হয়েছে।’
স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ যেখানে শিশুকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সময় নিলো, সেখানে শিশুর বাপ-মা কি তাদের কথা চিন্তা করে না!
যে আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচয় হলো সাজিদা ও নুরির তারা কী ভবিষ্যতে ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারবে?এমন প্রশ্নের জবাবে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজের প্রভাষক ডা. আনিসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জঙ্গি আস্তানা থেকে বের হয়ে আসা শিশুদের মেডিক্যালের ভাষায় ফোবিয়া ও ইউলিশন হতে পারে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে বধিরতা দেখা দিতে পারে। এমনকি মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। এজন্য এখন তাদের ভালো পরিবেশে রাখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জঙ্গি আবুর স্ত্রী তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা। এই জঙ্গি আস্তানায় দিন কাটানোর ফলে এমনও হতে পারে যে, সে একটি বিকলাঙ্গ বাচ্চা প্রসব করেছে। একজন অভিভাবক হিসেবে আবু কতগুলো বিপদের মধ্যে স্ত্রী-সন্তানদের ঠেলে দিয়ে নিজে মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছে।’
শিবগঞ্জ উপজেলার রাঘবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা শিশুদের আগামী দিনের জন্য তৈরি করি। কিন্তু আবুর সন্তানরা যখন স্কুলে আসবে তখন সহপাঠীরা না বুঝে অনেক কথা বলবে। যাতে তাদের আঘাত লাগতে পারে। বাবা হিসেবে কখনও আবু এসব চিন্তা করেনি। সে যদি এসব চিন্তা করতো তাহলে এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না তার সন্তানদের।’
এ প্রসঙ্গে রাজশাহীর বোসপাড়া মসজিদের ইমাম আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘এটা ঠিক না। আপনি মানুষকে ইসলাম ধর্মের দাওয়াত দিতে পারেন। দাওয়াত কবুল না করলে আল্লাহ তার বিচার করবে। ইসলাম ধর্মে মানুষকে মারা নিষেধ আছে।’
এ ব্যাপারে মানবাধিকার কর্মী এহেসানুল হক ইমন বলেন, ‘আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থায় এখনও নারীরা স্বামীর অধীনস্থ থেকে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। একইভাবে জঙ্গিরাও নারী-শিশুদের অসহায়ত্বের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহার করছে।’
প্রসঙ্গত, জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে শিবনগর এলাকার এক বাড়িতে বুধবার (২৬ এপ্রিল) ঘিরে রাখে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। পরে ঢাকা থেকে সোয়াট টিম গিয়ে অভিযান চালায়।
/এমও/এসটি/