এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মতিন ও তুফানের বাবার নাম মজিবর রহমান। তিনি মোট সাত ছেলের পিতা। সন্তানদের কেউ স্কুলের গণ্ডি পার হয়নি। আগে বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুর চামড়া গুদাম এলাকায় রিকশা চালাতেন মজিবর। তবে স্বাধীনতার পর এলাকার রাস্তায় চামড়া কেনাবেচা শুরু করেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, মজিবর রহমানের সাত সন্তানের মধ্যে ছয় জন মাদক ব্যবসা ও একজন ভূমি দস্যুতার সঙ্গে জড়িত। সাত ভাইয়ের বড় ভাই মতিন ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় ভাই মতিন এখন আত্মগোপনে থাকলেও তার মাদক ব্যবসা দেখাশোনা করছে ‘সুইপার সোহেল’ নামের এক যুবক। তৃতীয় ভাই পুটু সরকার হেরোইনের কারবারি হিসেবে এলাকায় পরিচিত। চতুর্থ ভাই সোহাগ সবধরনের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পঞ্চম ভাই ঝুমুর ও ষষ্ঠ ভাই ওমর ইয়াবার ব্যবসা করে। এছাড়া ছোট ভাই তুফানের মূল ব্যবসা ছিল ফেনসিডিল। এরা সবাই যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাদক ব্যবসা ছাড়াও জুয়া, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত তারা। তুফান গ্রেফতার হওয়ার পর মতিনসহ ও অন্যরা আত্মগোপন করেছে। তবে তাদের মাদক ব্যবসা বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা আরও জানান, মতিন সরকারের হাত ধরে শ্রমিক লীগে যোগ দেওয়ার পর বাণিজ্য মেলায় জুয়া পরিচালনা, চার্জার ব্যাটারি রিকশায় চাঁদাবাজি, ভূমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে তুফান। এরপর মাত্র কয়েক বছরেই কোটিপতি হয়ে যায় সে। এরপর থেকে একাধিক প্রাইভেট কার নিয়ে চলাফেরা শুরু করে তুফান। বগুড়া শহরে তুফানের একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট আছে। এমনকি ঢাকাতেও ফ্ল্যাট আছে তার। বগুড়া শহরে কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেনেটারি স্টোর করেছে সে। তুফানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ ৪টি মামলা রয়েছে বলেও জানান ওই এলাকার বাসিন্দারা।
এ ব্যাপারে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, কয়েক বছর আগে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিল তুফানের ভাই মতিন। এ মামলায় তার ২৭ বছরের জেল হয়। তবে উচ্চ আদালতে মামলাটি স্থগিত হয়ে আছে। ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট শহরের চকসুত্রাপুর চামড়া গুদাম লেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ফেনসিডিল, বিয়ার, হেরোইন, বিদেশি চাকু, জুয়া খেলার সরঞ্জাম ও ১০ লাখ টাকাসহ তাকে আটক করে র্যাব। পরদিন র্যাবের তৎকালীন অধিনায়কের অপসারণের দাবিতে স্থানীয় যুবলীগ শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছিল। পরবর্তীতে মতিনের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ওই র্যাব কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে বগুড়া ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে যেতে হয়। মতিনকে পুলিশ চার বার, র্যাব দুই বার এবং যৌথ বাহিনী একবার গ্রেফতার করেছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় রাজনীতিকের কাছে জানা যায়, শহরের এক যুবলীগ নেতা মতিনকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। পরে অনেকেই তাকে লালন-পালন করেছেন। কক্সবাজারের টেকনাফ এলাকায় এক ইয়াবা ব্যবসায়ী এবং দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত এলাকায় এক ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসায়ীর সঙ্গে মতিন ও তুফানদের সখ্যতা রয়েছে। বিভিন্নে মাধ্যমে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকদ্রব্য তাদের চকসূত্রাপুরের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাছে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে জেলার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এসব মাদকদ্রব্য। এরপর বগুড়া শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ও সুলতানগঞ্জপাড়া, কালিতলা, ফুলবাড়ি, নামাজগড়, কামারগাড়িসহ পাড়া-মহল্লায় এ মাদক বিক্রি হয়।
এসব তথ্য পুলিশ জানা থাকলেও তারা মতিন ও তুফান-ভাইদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এ ব্যাপারে বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘তুফান পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসাসহ অন্যান্য অভিযোগের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হবে।’
/এফএস/এএইচ/