প্রতি ডিমে দেড় টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন রাজশাহী পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশেনের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি ডিমে দেড় টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে খামার বন্ধ হতে শুরু করেছে। এই অবস্থা আরও এক মাস থাকলে রাজশাহীর ৯০ ভাগ লেয়ার মুরগির খামার বন্ধ হয়ে যাবে।’ বিভিন্ন স্থান থেকে ঋণ নিয়ে খামারিরা কোনও রকমে টিকে আছেন বলেও জানান তিনি।
ডিম ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ‘বড় বড় ফিড ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে ডিমের খামারের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেড়ে গেছে। তাই অধিক ডিম উৎপাদন হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খামারিরা।’
রাজশাহী নগরীর দড়িখোড়বোনা এলাকার মুদি দোকানি মতিউর রহমান বলেন, ‘১০০ সাদা ডিমের দাম ৪০০ টাকা, লাল ডিম ৪৪০ টাকা, দেশি হাঁসের ডিম ৬০০ টাকা, দেশি মুরগির ডিম ৭০০ টাকা, সোনালি মুরগির ডিম ৬০০ টাকা, কোয়েলের ডিম ১০০ টাকা দরে খামার থেকে ক্রয় করছেন।’
সেলিম রেজা আরও জানান, আগের থেকে অনেক বেশি খামার তৈরি হয়েছে এবং উৎপাদনও বেশি হচ্ছে। ফলে ডিমের দাম কমে গেছে। তবে ওষুধ ও ফিড ব্যবসায়ীদের বেশি লাভের কারণে লোকসানে ভুগছেন খামারিরা। খামারিদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনও কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কারণ এসব বিষয় ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
খামারিরা জানান, ওষুধ ও ফিড ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো সব জিনিসের দাম বাড়ায় কিন্তু তা দেখার কেউ নেই। খামারিরাও বাধ্য হন উচ্চমূল্যে তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনতে। এসব পণ্যের দাম কম হলে ডিমের উৎপাদন খরচ কমে যেত।
নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত কাপাসিয়া এলাকার আইডিয়াল পোল্ট্রি ফার্মের খামারি মেরিনা পারভিন বলেন, ‘এখন ৪৪ হাজার টাকার ডিম পেতে মুরগির খাবার বাবদ খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ৬৪ হাজার টাকা। এত লোকসান দিয়ে মুরগি পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য এই মাস থেকেই খামারের মুরগি বিক্রি করা শুরু করেছি। গত ১০ দিনে প্রায় ৯ হাজার মুরগি বিক্রি করা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা ফিডের জন্য খরচ হওয়া সত্ত্বেও সব মুরগি একবারে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না গ্রাহকের অভাবে।’
প্রায় ১২ বছর ধরে পাঁচ বিঘার জমির ওপর একটি খামার তৈরি করেছেন মেরিনা পারভিন। কয়েক বছর ব্যবসা ভালো চললেও গত বছর থেকে লোকসান গুনছেন।
ফিডের দাম বৃদ্ধি ও ডিমের দাম কমের ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, ‘এক বছর ধরে লোকসান দিয়েই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে আবারও ডিমের মূল্য কমে যাওয়ায় ব্যবসা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে প্রতি বস্তা ফিডের দাম ছিল ১৬০০ টাকা, সেখানে গত সপ্তাহ থেকে মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৫০ টাকা। অথচ এরইমধ্যে আবারও ডিমের দাম কমে গেল। ফিডের দাম যখন ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা ছিল, তখনও ডিমের দাম একই ছিল।’
এদিকে রাজশাহীর পুঠিয়া ও কাটাখালির একাধিক খামারির অভিযোগ, খামারিদের জব্দ করার জন্য বড় ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে লোকসান দিয়ে দুই মাস বাজারে ডিম ছাড়ে। ফলে ডিমের দাম পড়ে যায়। এতে খামারিরা নিঃস্ব হয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। তখন ব্যবসায়ীরা ডিমের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে তা বাজারজাত করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে লোকসান গুণে রাজশাহীর প্রায় ১০০ খামারি ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা খামারিদের মুরগির বাচ্চা থেকে শুরু করে ওষুধ ও ফিড পর্যন্ত দিয়ে থাকেন ফাঁকা ব্যাংক চেকের মাধ্যমে। নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে না পারলে তখন ওই চেক নিয়ে তারা খামারিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তখন খামার বিক্রি করেই টাকা দিতে বাধ্য হন খামারিরা।
ডিমের বাজারের মন্দা অবস্থা ও খামারিদের ব্যাপারে রাজশাহী জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় ডিম দেওয়া লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে ৫৭৭টি। এই খামারগুলো থেকে বছরে প্রায় তিন কোটি টাকার ডিম উৎপাদন হয়। তাই খামারিদের টিকিয়ে রাখার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অন্য জেলায় ডিমের চাহিদা বেশি থাকলে সেখানে পাঠানোর জন্য পরামর্শ দিচ্ছি।
এ ব্যাপারে নগরীর সাহেব বাজার ডিম ব্যবসায়ী আতাউর রহমান বলেন, প্রতিটি ফার্মের সাদা ডিমের দাম চার টাকা ৩০ পয়সা, লাল ডিম ৫ টাকা ১০ পায়সা, দেশি হাঁসের ডিম ৬ টাকা, দেশি মুরগির ডিম ৭ টাকা, সোনালি মুরগির ডিম ৬ টাকা ৫০ পয়সা, কোয়েল পাখির ডিম ১ টাকা ২০ পয়সা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু ক্ষুদ্র বাজারে সিদ্ধ ডিমের দাম কাঁচা ডিমের দামের প্রায় দ্বিগুণ।
নগরীর কুমারপাড়ার সিদ্ধ ডিম ব্যবসায়ী মাইনুল ইসলাম জানান, শীতের সময় প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০টি ডিম বিক্রি হয়। আর গরমের সময় ১২০ থেকে ১৫০টি ডিম বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি সিদ্ধ লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা, দেশি হাঁসের ডিম ১৩ টাকা, দেশি মুরগির ডিম ১২ টাকা ও কোয়েল ৩ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।