সিরাজগঞ্জে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে মারামারি বা সংঘর্ষের ঘটনায় জখম রোগীদের সরবরাহকৃত ‘গ্রিভিয়াস’ নামে পরিচিত ডাক্তারি সনদপত্র। আদালত বা থানা পুলিশের চাহিদা ছাড়াই জেলা সদরের সরকারি হাসপাতাল থেকে সাধারণ জখম রোগীদের হাতে ‘গ্রিভিয়াস’ বা গুরতর জখমের সনদপত্র দেওয়া হচ্ছে। ৩২৬ ধারা সংযোজন করে ‘আদারস সেকশনের’ মামলা জটিল করতে বা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এসব গ্রিভিয়াস বা গুরুতর জখমের ডাক্তারি সনদ সংগ্রহ করা হচ্ছে। রোগী বা তাদের স্বজনদের প্ররোচণায় অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সদর হাসপাতাল থেকে ভুয়া ‘গ্রিভিয়াস’ সনদ প্রদানের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পুলিশকে না জানিয়ে শুধু কাগজ-কলমে হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে জরুরি বিভাগ থেকে ‘গ্রিভিয়াস’ সনদপত্র নেওয়ার অভিযোগ বাড়ছে।
সদর হাসপাতালের ‘গ্রিভিয়াস’ সনদপত্র সহজলভ্য হওয়ায় সিরাজগঞ্জে ভুয়া বা মিথ্যা মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। অন্যদিকে মামলা বিচারে ওঠার আগেই অধিকাংশই সামাজিকভাবে মিমাংসা হয়ে যাওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তারাও বিড়ম্বনায় পড়ছেন। মামলার পর পরই সামাজিক মিমাংসার কারণে বাদীকে দিয়ে অভিযোগ উত্তোলনে কৌশলে এফিডেভিডও করানো হচ্ছে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলেও এফিডেভিডের কারণে পুলিশকে বাধ্য হয়ে মামলার ফাইনাল দিতে হচ্ছে। ‘আদারস্ সেকশনের’ অধিকাংশ মামলা আদালতে বিচারে না গিয়ে বরং সামাজিকভাবে তা মিমাংসা হওয়ায় জখম রোগীদের ভুয়া সনদ প্রদানের বিষয়টিও আদালতে প্রমাণ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। যে কারণে অসৎ চিকিৎসকরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন। দিনে দিনে আরও তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি জেলা আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি সভায় বারবার আলোচনা হলেও আমলে নেয়নি স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের সাবেক সিভিল সার্জন ও সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মঞ্জুর রহমান ভুয়া ডাক্তারি সনদ প্রদান ও চিকিৎসকদের দমনে এর আগে লাগাম টেনে ধরেন। স্বাস্থ্য অধিফতরের নির্দেশ ও পরিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে আদালত বা থানা পুলিশের চাহিদা ছাড়া কোনও ডাক্তারি সনদ দেওয়া যাবে না মর্মে তিনি চিকিৎসকদের নির্দেশনা দেন। যে কোনও জখম রোগীদের ডাক্তারি সনদ দেওয়ার আগে হাসপাতালে ভর্তি নিশ্চিতকরণ, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে অবহিতকরণ এবং হাসপাতালের তিন জন চিকিৎসকের বোর্ড গঠন করে সনদপত্রে তাদের স্বাক্ষর প্রদানের নিয়ম করে দেন। ওই কিছুদিন সেটি মানা হলেও পরে তা আগের মতোই।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিপত্রে রয়েছে, সরকারি জেলা সদরের হাসপাতালে জখম রোগীরা এলে নিজ নিজ থানায় খবর দিয়ে তাদের ভর্তি ফরম ও টিকিটের ওপর পুলিশ কেসের সিল মেরে তবেই তাদের ভর্তি করতে হবে। এমনকি, চিকিৎসা শেষে মামলার জন্য ডাক্তারি সনদের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বা আদালতের চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতাল থেকে ডাক্তারি সনদপত্র সরবরাহেরও বিধান রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন সদস্যের চিকিৎসকদল বোর্ড গঠনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রোগীকে উপযুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তারি সনদ প্রদানে নির্দেশনা থাকলেও সিরাজগঞ্জে প্রায়ই তার ব্যত্যয় ঘটছে।
জেলা সদরের আড়াই’শ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত বেশ কয়েকজন অসাধু ওয়ার্ডবয়, ব্রাদার্স ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই রয়েছে। আদালত ও থানা পুলিশের চাহিদা ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে গত ক’বছর ধরেই তারা বেপরোয়াভাবে এসব সনদপত্র সরাসরি রোগী বা তাদের স্বজনদের সরবরাহ করে আসছেন। সম্প্রতি জেলা আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশ-ম্যাজিট্রেসি সভায় এ ধরনের অভিযোগ উঠলেও মোটেও তৎপর হননি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, এমনকি সতর্ক হননি জেনারেল হাসপাতালে অসাধু ওয়ার্ডবয়, ব্রাদার্স ও চিকিৎসকরাও।
সরকারী এ হাসপাতালের অজ্ঞাত পরিচয়ের দুই জন অসহায় নারী রোগীকে যমুনার পাড়ে গত ২৫ অক্টোবর ফেলে দেওয়ার ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীরা এসব ডাক্তারি সনদ বাণিজ্যের বিষয়টি অবগত হন। তারা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রমেশ চন্দ্র সাহাকে এ বিষয়টি জানান। এরপর গোপনে অনুসন্ধান করে তিনি নিজেই এসবের প্রমাণ পেয়ে সোচ্চার হন। নোটিশ জারি করে রেজুলেশনের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার (২২ নভেম্বর) জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের সতর্ক করেন তিনি।
সদর থানার উপপরিদর্শক মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়নের ভেন্নাবাড়ি গ্রামের সুমন শেখ গত ১৫ অক্টোবর তারিখে একটি মারামারির ঘটনায় সদর থানায় আদারস্ সেকশনের একটি মামলা করেন। আদালত ও থানা পুলিশের চাহিদা ছাড়াই তিনি মামলায় ৩২৬ ধারা যুক্ত করার আশায় তার জখমের জন্য সদর হাসপাতাল থেকে গ্রিভিয়াস সনদপত্র সংগ্রহ করেন। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও সামান্য আঘাতের চিহ্ন ছিল, যা পরবর্তীতে তদন্তে পাওয়া যায়। রোগীর বাস্তব জখমের অবস্থায় ৩২৪ ও ৩২৫ ধারা হলেও গ্রিভিয়াস সনদপত্র থাকায় মামলাটি ৩২৬ ধারায় রেকর্ড করা হয়। পরবর্তীতে এটি সামাজিকভাবে মিমাংসা হওয়ায় মামলাটি আর বিচারে ওঠেনি। চিকিৎসকদেরও আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসতে হয়নি।’
পূববর্তী সিভিল সার্জন যিনি বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক ডা. মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘আমার সময় জেলা আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি সভায় চিকিৎসকদের গ্রিভিয়াস সনদপত্র সরবরাহের বিষয় নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ উত্থাপন হয়। এ কারণে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিপত্র অনুয়ায়ী সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বপ্রাপ্ত তিন সদস্যের চিকিৎসকদল বোর্ড গঠনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রোগীকে উপযুক্ত পরীক্ষার মাধ্যম্যে ডাক্তারি সনদ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।’
বর্তমান সিভিল সার্জন ডা. কাজী শামিম হোসেন বলেন, ‘আমি যখন হাসপাতালে চিকিৎসক ছিলাম, তখন আদালত বা থানা পুলিশের চাহিদা ছাড়া কোনও ডাক্তারি সনদ সরবরাহ করতাম না। আমি সিভিল সার্জন হলেও হাসপাতালের যিনি তত্ত্বাবধায়ক আছেন তিনি আমার ওপরে। তারই বিষয়টি দেথার কথা।’
সিরাজগঞ্জ আড়াই’শ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রমেশ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘আদালত বা থানা পুলিশের চাহিদা ছাড়া কোনও ডাক্তারি সনদ সরবরাহ করা যাবে না মর্মে স্বাস্থ্য অধিফতরের নির্দেশনা রয়েছে। তিন সদস্যের চিকিৎসকদল বোর্ড গঠনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রোগীর উপযুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ডাক্তারি সনদ প্রদান করা যাবে। কিন্তু, সনদ পাবে আদালত বা পুলিশ, রোগী নয়। সভা ও রেজুলেশন করে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের এরই মধ্যে সতর্ক করা হয়েছে। নিষেধ অমান্য করে সনদ দিয়ে আদালতে তিরষ্কৃত বা শাস্তিপ্রাপ্ত হলে আমি দায়িত্ব নেব না।’
অর্থের বিনমিয়ে ভুয়া গ্রিভিয়াস সনদ সরবরাহের বিষয়টি অস্বীকার করে সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. ফয়সাল আহম্মেদ, ডা. শামিমুর রহমান ও ডা. রোকনউজ্জজামান বলেন, দলীয় লোকজনের কারণে বাধ্য হয়ে রোগীদের ডাক্তারি সনদ দিতে হয়।
আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের কোনও আইন নেই যে রোগীর হাতে জখমের সনদ দেওয়া যাবে না। পুলিশের চাহিদার বিষয়টি মানতে গেলে সেখানে পুলিশের বাণিজ্যেরও সুযোগ থাকে। আমরাও পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায়ই এ ধরনের অভিযোগ পেয়েই রোগীর হাতে সরাসরি সনদ দিচ্ছি। থানায় মামলা না করে যদি কেউ আদালতে মামলা করেন, রোগীর হাতেই তো তখন ডাক্তারি সনদ দিতে হবে।’