নগরীর সাহেববাজার, শালবাগান, বানেশ্বর ও উপশহর নিউ মার্কেট এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে গুটি লিচু। তবে, নতুন ফল হিসেবে ১শ লিচু সাড়ে ৩শ থেকে ৪২০ টাকা দাম হাকাচ্ছেন বিক্রেতারা। ক্রেতারা বলছেন, নতুন ফল হিসেবে দাম বেশি চাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট এলাকায় লিচু বিক্রি করতে আসা হাসমত আলী জানান,নতুন লিচু উঠেছে। তাই দাম একটু বেশি।
উপশহর নিউ মার্কেট এলাকায় লিচু বিক্রি করতে আসা নাহারুল ইসলাম জানান,তিনি নগরীর বায়া এলাকার একটি বাগান থেকে লিচু কিনেছেন। তিনি ৪২০ টাকা দরে লিচু বিক্রি করছেন।
লিচু ক্রেতা হিমু খান বলেন, ‘নতুন ফল, দামেও বেশি। তাই ৫০টি কিনলাম। দাম কমলে তখন বেশি করে কিনবো।’
নগরীর উপকণ্ঠে জামিরা এলাকার মতিউর রহমান জানান, তাদের সাতটি লিচুর গাছ আছে। সাতটি লিচুর গাছের ফল এবার ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। গতবার ১ লাখ ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন। গতবারের চেয়ে এবার ঘন কুয়াশার কারণে লিচুর ফলন কম হয়েছে। তাই তারা গতবারের চেয়ে দাম কম পেয়েছেন।
তিনি আরও জানান, বাগানের সাতটি গাছের মধ্যে গুটি জাতের দুইটি গাছের লিচু গাছ থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা নামিয়েছেন। আর বোম্বে লিচুর রঙ ধরেছে। একমাসের মধ্যে বোম্বে লিচু তারা গাছ থেকে নামাবে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তারা গতবারও আমাদের সাতটি গাছের লিচু কিনে সব বাদ দিয়ে ৩৫ হাজার টাকা লাভ করেছিল।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘এ বছর ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে। এছাড়া গত বছর ৪৭৬ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়। ’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, গেলো কয়েক বছরে আমের পাশাপাশি শুধু লিচু চাষ করেই জেলার শতাধিক চাষি স্বনির্ভর হয়ে উঠেছেন। এখন ছোট-বড় মিলিয়ে রাজশাহী শহরেই শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে। বাগান ছাড়াও বসতবাড়িতে দেশি লিচুর পাশাপাশি উচ্চ ফলনশীল চায়না-৩ এবং বোম্বে ও মাদ্রাজি জাতের লিচু চাষ হচ্ছে। তাই হালে লিচু চাষও জনপ্রিয়তা পেয়েছে এ অঞ্চলে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) আবদুল ওয়াদুদ বলেন, ‘লিচু চাষেও কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। লিচু চাষ করে অনেক কৃষক স্বাবলম্বী হয়ে ওঠায় এবার লিচুতেও নীরব বিপ্লব ঘটতে চলেছে।’
রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন, ‘এখন বাজারে যে লিচু পাওয়া যাচ্ছে। এটা হচ্ছে একেবারে রাজশাহীর জাত (বারি লিচু-১)। এই লিচু ২০ মে বাজারে এলে টক লাগবে না। সেইসঙ্গে মাংসও হবে বেশি। কিন্তু, ব্যবসায়ীরা বেশি দামের আশায় গাছ থেকে নামিয়ে তাড়াতাড়ি বাজারে লিচু এনেছে। এতে করে লিচু টক লাগছে। আবার বেশি দেরি করে গাছ থেকে লিচু নামালে পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। এতে করে চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের ভয়ে একটু রঙ ধরলেই লিচু বিক্রি করতে শুরু করে দিয়েছেন। বোম্বে লিচু জুন মাসে উঠবে। এরপর চায়না লিচু উঠবে।’
ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে আব্দুল আলীম বলেন, ‘এবার আম-লিচুর ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। কারণ গাছে মুকুল আসার পর থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে করে সেচের সুবিধাটা ভালো পেয়েছে। তবে বর্তমানে গরমের কারণে আম ও লিচুর গায়ে রোদের পোড়া দাগ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
রাজশাহী নগরীর রায়পাড়া, বুলনপুর, ছোটবনগ্রাম ও কাটাখালি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লিচুর চাষ শুরু হয়েছে। এছাড়া জেলার বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, পবা ও গোদাগাড়ী উপজেলাতেও চাষ হচ্ছে লিচুর। এবার মাঝে-মধ্যে ঝড় হলেও লিচুর ফলন ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চাষিরা জানিয়েছেন, গত বছর ঝড়ের কারণে গাছের অধিকাংশ লিচু ঝরে গিয়েছিল। এতে অনেকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবার ঝড় হলেও তা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বড় ধরনের ঝড় না হলে লিচুর ফলন ভালো হবে।
নগরীর রায়পাড়া এলাকার লিচু চাষী ওলিউল ইসলাম জানান, এবার যদি শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো থাকে। তাহলে ফলন ভালো হবে। যারা আগাম বাজারে লিচু নিয়ে এসেছে, তারা বেশি দামের আশায় এই কাজ করেছে।
নগরীর উপশহর এলাকার লিচু ক্রেতা জিএম বাবুল চৌধুরী পরিবারে সদস্যদের জন্য লিচু কিনেছেন। তিনি জানান, লিচুর স্বাদ মিষ্টি হয়নি।
নগরীর ভদ্রা এলাকার রায়হানুল ইসলামসহ ১৭ জন বন্ধু মিলে পশ্চিমপাড়া এলাকায় এবার ২৭টি লিচু ও ৩০টি আম গাছ লিজ নিয়েছেন।
রায়হানুল ইসলাম জানান, ২৭টি লিচু গাছের জন্য দুই বছরে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় লিজ নেওয়া হয়েছে। লিজ নেওয়ার পর গাছে পরিচর্চা হিসেবে কীটনাশক, নেট জাল, মাচান তৈরি ও পাহাদার নিয়োগ করা হয়। তাই আরও বাড়তি খরচ হয়। তাই আশা করছি। এবার লিচুর দাম ভালো পাওয়া যাবে।