চৌবাড়িতে ‘হুড়াসাগর নদী’ ভরাট করে ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ নির্মাণ করা হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জাহাঙ্গীর আলম এ প্রকল্পের দায়িত্বে আছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজে তাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ড শিফা নুসরাত।
‘কামারখন্দ উপজেলায় সরকারি কোনও প্রকল্পের অনিয়ম বা দুর্নীতি খুঁজতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের ইউএনও জাহাঙ্গীর আলমের পূর্বানুমতি নিতে হবে’ বলে কামারখন্দ প্রেস ক্লাবে দেওয়া ইউএনও’র একটি বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়। এ নিয়ে তিনি খুব সমালোচিত হন।
সরেজমিন দেখা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের প্রায় ৩৫ লাখ টাকা অর্থায়নে কামারখন্দের বলরামপুর ও চৌবাড়িতে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে বালু ভরাট শেষ হয়েছে। ২৫টি দুস্থ ও হতদরিদ্র পরিবারের আবাসন তৈরির জন্য কাঠ ও টিনসহ অন্যান্য মালামালও আনা হয়েছে। ১০টি পরিবারের জন্য কামারখন্দ চৌবাড়ি ইউনিয়নের বলরামপুরের ৪৮ শতক খাস (ফসলি) জমিতে বালি ফেলা হয়েছে। প্রকল্পের উপকারভোগী আরও ১৫টি পরিবারের জন্য চৌবাড়ি গ্রামের দিপু চৌধুরীর বাড়ির অদূরে হুড়াসাগর নদীর পূর্বপাড় থেকে নদীর অর্ধেকটা দখল করে বালির পাহাড় বানানো হয়েছে। ইউএনও এবং এসিল্যান্ডসহ প্রকল্প কর্মকর্তারা কয়েকদফা পরিদর্শন শেষে জায়গাটি নির্বাচন করেছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, সরকারের ‘ডেল্টা পরিকল্পনার’ মাধ্যমে পাউবো থেকে জেলার যমুনা, করতোয়া, বাঙ্গালি, ফুলজোড় ও হুড়াসাগরসহ অন্যান্য নদ-নদী প্রায় ১৩শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে খননের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। হুড়াসাগর নদীটি বর্তমানে খালের মতো হলেও এটা এক সময় যমুনার শাখা নদী ছিল। কৃষি জমিতে সেচ দেওয়াসহ হুড়াসাগড় নদী জেলার আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব রাখে বলে বিগত বছর মৎস্য বিভাগ থেকে নদীর বিভিন্ন অংশ খননের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আগামীতে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অংশ খননে পাউবোর ডেল্টা খনন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ডেল্টা খনন প্রকল্প শুরুর আগে হুড়াসাগর নদী ভরাটের কাজ বন্ধ না হলে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাউবোর উপবিভাগীয় রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হুড়াসাগর নদীতে বালু ভরাট করে প্রকল্প শুরুর আগে পাউবোর মতামত নেওয়া উচিত ছিল। নদীর তলদেশে যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি বা পানি প্রবাহ বন্ধ করে বলগেট দিয়ে বালি উত্তোলন ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে নিষিদ্ধ থাকলেও উপজেলা নির্বাহী অফিসার কীভাবে এ ধরনের নির্বুদ্ধিতার কাজ করলেন, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হুড়াসাগর নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ ও বালি ভরাট করে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ একবারেই অপরিকল্পিত। এটি ডেল্টা খনন পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ প্রকল্পের শুরুতে পাউবোর মতামত নেওয়া হয়নি। এমনকি, কাজের লেআউট দেওয়ার জন্যও পাউবোর কাউকে ডাকা হয়নি। প্রকল্পটি বন্ধ করতে এরই মধ্যে প্রশাসনকে বলা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে কামারখন্দের এসিল্যান্ড শিফা নুসরাত বলেন, ‘হুড়াসাগর নদীর পাড়ে চৌবাড়ি ও বলরামপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের জমি ‘খাস কৃষি জমি’ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় আমি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলাম। ওই সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমার পরিবর্তে দায়িত্বে ছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘প্রকল্পটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এটি শুরুর আগে-পরে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কয়েক দফা পরিদর্শন করেছেন।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) চৌধুরী মো. গোলাম রাব্বী বলেন, ‘পানি প্রবাহ বন্ধ বা কৃষি জমি ভরাট করে প্রকল্প গ্রহণ সরকারি নীতিমালার বাইরে। প্রকল্পটি আমি সরেজমিন দেখবো।’