শেষবারের মতো বাবার মুখটাও দেখতে পারিনি: খায়রুজ্জামান লিটন

 




শহীদ কামারুজ্জামানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন ও অন্যরা পত্রিকার খবরে বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলেন। আমরা দুই ভাই কাঁদতে শুরু করলাম। কোলকাতায় তখন আমাদের কোনও অভিভাবক ছিল না। আমরা বাড়ি ফিরতে চাইলাম, কিন্তু আমাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের বাড়ি ফিরতে দেয়নি। দাফন করার জন্য বাবার দেহ ঢাকা থেকে রাজশাহী নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা শেষবারের মতো বাবার মুখটাও দেখতে পারিনি।





মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জেলহত্যা দিবসের আলোচনায় আবেগাপ্লুত সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।
রাসিক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারে সদস্যদের এবং ৩রা নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে বিশেষ একটি উদ্দেশ্য নিয়েই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এটির বেনিফিশিয়ারি হিসেবে জিয়াউর রহমানসহ ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী নানা নামে নানা ব্যানারে দীর্ঘদিন এই দেশটি পরিচালনা করেছে। মূলত তারা সবাই এক ও অভিন্ন। সেই কারণে ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ব্যাপারে কথা বলা যায়নি। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে বিচারের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যারা নির্মম এইসব হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ করে রেখেছিলেন, তাদের তিরস্কার তো করতেই হবে। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর এইসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত সরকার বিচার প্রক্রিয়া ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। পরবর্তীতে আবারও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার কার্যকর করা হচ্ছে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায় আছেন আমরা আশা করি এসব হত্যার বিচার ও শাস্তি কার্যকর দ্রুত সম্পন্ন হবে।
জেল হত্যা দিবস স্মরণে দোয়া মাহফিলে লিটনসহ অন্যরা মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শহীদ বাবা এএইচএম কামারুজ্জামান সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন লিটন। বলেন, কী অপরাধ ছিল বাবার, যার জন্য তাকে হত্যা করা হলো? মাত্র ৫২ বছরের জীবনে যিনি অর্ধেকটাই কাটিয়েছেন আন্দোলন আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতাযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অন্য জাতীয় নেতাসহ দেশকে স্বাধীন করার জন্য যিনি জীবনোৎসর্গ করেছেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানের দিকে তাকানোর ফুরসত পাননি, সেই মানুষটাকে কোন অপরাধে হত্যা করা হলো? তা আমরা জানি না। তবে হত্যাকারীরা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় ৪ নেতাসহ শহীদদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
মেয়র লিটন বলেন, আমার বাবা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান জাতীয় ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশের ইতিহাসের চূড়ান্ত সংকটকালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধে যে কয়েকজন নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি তাদেরই একজন। আমি শহীদ কামারুজ্জামানের সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করি।
বাবার স্মৃতিচারণ করে লিটন বলেন, বাবা বেশ ধর্মভীরু ছিলেন। ছোটবেলায় আমরা তাকে নিয়মিত নামাজ আদায় ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখেছি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের জন্য বাবা অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। যতক্ষণ বাসায় থাকতেন সর্বক্ষণ নেতাকর্মীদের দ্বারা পরিবেষ্ঠিত থাকতেন। ফলে আমরা তেমন সঙ্গই পেতাম না। আমরা বাবাকে মিস করতাম।
তিনি আরও বলেন, বাবা অত্যন্ত নরম স্বভাবের ছিলেন। তাই বলে আমরা তাকে ভয় পেতাম না, এমন নয়। মায়ের উদারতা ও সহায়তা না থাকলে বাবার পক্ষে রাজনীতিতে সফলতা অর্জন সম্ভব ছিল না।
গরিবদের মধ্যে খাবার বিতরণ করছেন মেয়র এদিকে মঙ্গলবার দুপুর ১টায় মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গরীব, অসহায় ও দুস্থ্যদের মাঝে খাবার বিতরণ মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এ সময় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ দলীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সকাল থেকে শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের ঢল নামে।
এর আগে দিবসের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে শহীদ কামারুজ্জামানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন শহীদ কামারুজ্জামানের দৌহিত্র বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ডা. আনিকা ফারিহা জামান অর্ণা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগেও যথাযথ মর্যাদায় জেল হত্যা দিবস পালিত হয়েছে। জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, মৌনর‌্যালি, রক্তদান কর্মসূচি, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রাসিকের কাউন্সিলর, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ নগর ভবন হতে মৌন র‌্যালি বের করেন। র‌্যালিটি নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কাদিরগঞ্জে শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান এর কবরস্থানে গিয়ে শেষ হয়। এরপর ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয়।