স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও সংরক্ষণ হয়নি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বধ্যভূমি

রেহাইচর শ্মশাণঘাট বধ্যভূমি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। এ নির্মমতার সাক্ষী হয়ে আছে বেশকিছু বধ্যভূমি ও গণকবর। মুক্তিযুদ্ধে এ জেলার প্রায় ৫০ হাজার মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মমভাবে হত্যা করে হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনী। এ রকম কিছু বধ্যভূমি হলো কল্যাণপুর বিডিআর ক্যাম্প (বর্তমানে এটি ৫৩ বিজিবি’র মেইন ক্যাম্প), শশ্মানঘাট বধ্যভূমি, পুরাতন জেলখানা, নয়াগোলা, ইসলামপুর, হুজরাপুর, সোনামসজিদ-বালিয়াদীঘি গণকবর, শিবগঞ্জের বিনোদপুর, কলাবাড়ি, মনাকষায় হুমায়ুন রেজা উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনের আমবাগানে অবস্থিত বধ্যভূমি, আদিনা ফজলুল হক কলেজ সংলগ্ন বাগান, খাসেরহাট, দোরশিয়া,  রানিহাটি,  আলীনগর বাঙ্গাবাড়ি গণকবর, বোয়ালিয়া ও রহনপুর সমাধিস্থল উল্লেখ্যযোগ্য।  

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদর অভিযোগ, জেলার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে বার বার আবেদন করা হলেও; উল্লেখযোগ্য কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। অথচ এগুলো সংরক্ষণ ও দেখভালের দায়িত্ব যাদের ওপর বর্তায় (স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন) বরাবরই তারা দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। বেদখল হয়েছে অনেক জায়গা-জমি। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ না করায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থানগুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।  

মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানান, জেলার যেসব স্থানে স্মৃতিসৌধ ও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে সেগুলো অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। সেখানকার ইতিহাস সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহকারী ও গবেষক সাবেক অধ্যক্ষ এনামুল হক জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মদানকারী সাধারণ মানুষ ও সৈনিকদের সমাধিস্থল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং বর্তমান পর্যন্ত তার দেখভাল চলছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিকামী ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়ার পরেও তাদের বধ্যভূমি, গণকবর, সমাধিস্থল ও যুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো সঠিকভাবে আজও সংরক্ষণ করা হয়নি। গড়ে ওঠেনি ওইসব স্থানগুলোতে শহীদদের স্মরণে কোনও স্মৃতিসৌধ বা শহীদ মিনার। শুধু তাই নয়, যারা এর সুফলভোগী রাজনীতিবিদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কেউই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগুলি স্ব-স্ব এলাকায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি; যা জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। অথচ জাতীয় স্বার্থেই এসব স্থান সংরক্ষণ করার কথা ছিল।

সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘অযত্ন আর অবহেলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৭১ সালের বধ্যভূমিগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীনের ৪৯ বছর পরেও জেলার বধ্যভূমিগুলো এখনও সংরক্ষণ ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণে নেওয়া হয়নি উদ্যোগ। বেশিরভাগ বধ্যভূমি পড়ে আছে অবহেলায়। এমনকি এসব বধ্যভূমির অনেকগুলোরই সীমানা প্রাচীর পর্যন্ত নেই। আর যে দুই-একটির স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে সেগুলো দেখভালের অভাবে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’ 

সোনামসজিদ-বালিয়াদীঘি গণকবর মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে দীর্ঘ ৪৯ বছর পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের মহানন্দা নদী তীরবর্তী ‘রেহাইচর শশ্মানঘাট বধ্যভূমিটি’ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলার মুক্তিযোদ্ধারা। আগামী ১৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধনের কথা রয়েছে। তবে এখনও যেসব বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি এবং সেখানকার ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়নি তা বাস্ততবায়নে দ্রুতই পদক্ষেপ নিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। 

যুদ্ধকালীন কোম্পানি (ডালটা) কমান্ডার ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অ্যাডভোকেট আব্দুস সামাদ, মুক্তিযোদ্ধা প্রসেফর মো. ইব্রাহিম, এবং সাবেক কমান্ডার তরিকুল ইসলামসহ জেলার আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা ‘বাংলা ট্রিবিউন’ প্রতিনিধিকে জানান, কোনও কিছু প্রাপ্তির জন্য নয়, দেশের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছি। যা ছিল পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ ও বঞ্চনার অবসানের সর্ববৃহৎ পদক্ষেপ। 

তারা বলেন, ৪৯ বছর পরও রাজাকারদের তালিকা হয়নি। অথচ বার বার দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির নামে হয়রানি ও অসম্মান করা হচ্ছে। আবেগতাড়িত কণ্ঠে তারা আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেননি এত বছর বয়স না হলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া যাবে না। তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে তোমরা শত্রুর মোকাবিলা করো। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, বার বার সরকার বদলাবে আর নতুন নতুন তালিকা করা হবে, আর চলবে যাচাই-বাছাইয়ের নামে প্রহসন। এই প্রহসন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের যেন রেহাই দেওয়া হয়। 

বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি এবং সেখানকার ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় যেসব বধ্যভূমি রয়েছে সেগুলোতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং সংরক্ষণে আমরা কাজ শুরু করেছি। এরই মধ্যে এগুলো নিয়ে তালিকাভুক্তকরণ, চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলো বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়ে প্রজেক্ট আকারে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে কাজ শুরু হবে। 

জেলার উল্লেখযোগ্য বধ্যভূমি ও গণকবরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস 

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা সোনামসজিদ-বালিয়াদীঘি গণকবর

জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বালিয়াদীঘি এলাকায় ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ রাইফেলস, রাজশাহী সেক্টর নির্মিত ‘জীবনযুদ্ধে বিজয়ের শহীদ স্মারক স্তম্ভটি’ সঠিকভাবে দেখভালের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। মুক্তিযোদ্ধারা জানান, বর্তমানে এই গণকবরটির আশপাশের জায়গা বেদখল হয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। বর্তমানে সেখানে সাধারণ মানুষের কবর দেওয়া হচ্ছে।

 

বিনোদপুর শহীদ মিনার

১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের চানশিকারী, লছমনপুর ও এবাদত বিশ্বাসের টোলা গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে ৩৯ জন নিরীহ মানুষকে ধরে বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পে নিয়ে আসে পাকিস্তানি সেনারা। বিদ্যালয়ের মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে মাঠের দক্ষিণপাশের মাটিতে পুঁতে রাখে। পরবর্তীতে ৭২ সালে এ স্থানে ৩৯ জন শহীদদের স্মরণে একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে শহীদ মিনারটি। এটি সংস্কারের দাবি করেছেন শহীদ পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়রা। 

রহনপুর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর 

গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর রেলস্টেশনের পাশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১ পদাতিক ডিভিশন নির্মিত শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিসৌধটির সীমানা প্রাচীরের ভেতরের অংশ ঝোপঝাড় আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে আছে। জমেছে আবর্জনার স্তুপ। বেদিতে স্থানীয়রা নিয়মিত জ্বালানি খড়ি-কাঠ শুকায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ১০ হাজার সাধারণ মানুষকে এই বধ্যভূমিতে বিভিন্ন সময় ধরে এনে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রহনপুর সরকারি এবি উচ্চ বিদ্যালয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে শত শত মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হয়।

 

রেহাইচর শশ্মানঘাট বধ্যভূমি

দীর্ঘ ৪৯ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার দাবির প্রেক্ষিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহানন্দা নদী তীরবর্তী শশ্মানঘাট বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্মাণ হয়েছে স্মৃতিসৌধ। আগামী ১৪ ডিসেম্বর এই বধ্যভূমিটি উদ্বোধন করা হবে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে ৬ থেকে ৭ হাজার মানুষকে এখানে ধরে এনে হত্যা করা হয় বলে জানান মুক্তিযোদ্ধারা।

দোরশিয়া বধ্যভূমি

১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর দোরশিয়া এলাকার ৩৯ জনসহ আশপাশের গ্রামের আরও ২০ জন সাধারণ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করেছিলো হানাদাররা। সেদিনের ওই ঘটনায় শহীদ ৫৯ জনকে স্থানীয় মহিলারাই সমাহিত করে কোনও কাফন ছাড়াই এবং প্রতিটি কবরে ২ থেকে ৪ জনের লাশ সমাহিত করা হয়। অথচ এত বছর পরও এই বধ্যভূমিটি সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি কোনও উদ্যোগ। এমনকি সেখানে নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতিসৌধ। 

ইসলামপুর বধ্যভূমি

সদর উপজেলার ইসলামপুরে ৭১ সালের ১০ অক্টোবর ভোরে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদররা দুইশ’র বেশি মানুষকে হত্যা করে। যাদের মধ্যে পরবর্তীতে ১৩৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও বাকিদের পাওয়া যায়নি। সেদিন ইসলামপুরের পিয়ার বিশ্বাসের ঘাট, বালিয়াঘাটা ও সাহেবের ঘাট এলাকার বাড়িঘরসহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই স্থানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণে সরকারের কাছে বেশ কয়েকবার আবেদন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। আজ অবধি এমনকি ১০ অক্টোবরে শহীদদের স্মরণে এখানে কোনও স্মরণসভাও হয়না।

 

বোয়ালিয়া 

গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়ায় যুদ্ধ চলাকালে ১৯ সেপ্টেম্বর দুইশ’র বেশি সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। যাদের মধ্যে ১৫২ জনের নাম পরিচয় জানা গেলেও বাকিদের পরিচয় মেলেনি। সেদিন ধর্ষিত হয়েছিল ওই এলাকার বহু নারী। সম্প্রতি ৪১ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খেতাব দিয়েছে মন্ত্রণালয়। যার মধ্যে ১১ জনই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার। এদের মধ্যে ৯ জনের বাড়ী গোমস্তাপুর উপজেলার এই বোয়ালিয়া ইউনিয়নে। পরবর্তীতে এখানে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দেখভালের অভাবে সেটিও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। 

মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানান, শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হকের কবরটি সম্প্রতি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটি নামফলক টানানো হয়েছে। কিন্তু সেটি আজও অরক্ষিত আছে। কবরটি সংরক্ষণে মৌখিক ও লিখিতভাবে বার বার সরকারের কাছে আবেদন করেও এখনও বাঁধানো হয়নি। এই কবরটি সংরক্ষণে সরকারের কাছে জোর দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধাসহ শহীদ শামসুল হকের মাতা মালেকা বেগম। 

শহীদদের তালিকা 

৭১ সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরের সামনে একটি তালিকা স্তম্ভ করা হলেও, এখনও এ তালিকায় অনেকের নাম বাকি আছে। মুক্তিযোদ্ধারা জানান, অনেকের তালিকায় এখনও নাম ওঠেনি। অনেকের কবরগুলো সংরক্ষণে এখনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।