রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে আরও ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। রবিবার (৪ জুলাই) সকাল ৮টা থেকে সোমবার (৫ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। মৃত ১৮ জনের মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন করোনার উপসর্গ নিয়ে, পাঁচ জন মারা গেছেন করোনা আক্রান্ত হয়ে ও একজনের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ নিয়ে জুলাই মাসের প্রথম পাঁচদিনে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৮২ জনে। এদের মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন ২৮ জন।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মৃত ১৮ জনের মধ্যে রাজশাহীর আট জন, নাটোরের তিন, নওগাঁর চার এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-পাবনা ও কুষ্টিয়ার একজন করে রোগী রয়েছেন। এদিকে মৃত ১৮ জনের মধ্যে হাসপাতালের আইসিইউতে মারা গেছেন দুই জন। অন্যরা করোনার সাধারণ ওয়ার্ডে মারা গেছেন।
মৃতদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও ছয় জন নারী রয়েছেন। এদের মধ্যে সাত জনের বয়স ৬১ বছরের উপরে। বাকিদের মধ্যে ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে তিন জন, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সের দুই জন এবং ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সের ছয় জন রয়েছেন।
শামীম ইয়াজদানী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৯ জন। একই সময় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৮ জন। সোমবার সকাল পর্যন্ত ৪০৫ বেডের বিপরীতে চিকিৎসাধীন আছেন ৪৯৫ জন।
পরিচালক বলেন, রোগীর চাপ সামলাতে ৪ নম্বর ওয়ার্ডকে করোনা ইউনিটে যুক্ত করা হচ্ছে। এখানে ৫০টি অক্সিজেন লাইন বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। এ নিয়ে করোনা ইউনিটের বেডের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৫৫।
এদিকে রাজশাহীতে একদিনের ব্যবধানে বেড়েছে করোনা শনাক্তের হার। রবিবার রাতে দুটি ল্যাবে রাজশাহী জেলার ৬১৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২১০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। যা আগের দিনের চেয়ে দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি, শনাক্তের হার ৩৪ দশমিক ০৯ শতাংশ। শনিবার তা ছিল ৩৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এর আগে গত শুক্রবার ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ, গত বৃহস্পতিবার ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ, বুধবার ছিল ৩৯ দশমিক ৯০ শতাংশ, গত মঙ্গলবার ৩২ দশমিক ০৬ শতাংশ, গত সোমবার ৩৬ দশমিক ৯২ শতাংশ, রবিবার ২৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
ল্যাব সূত্র জানায়, রবিবার রাতে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল পৃথক দুটি ল্যাবে দুই জেলার ৬৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ এসেছে ২১৮ জনের। রাজশাহী জেলা ছাড়াও চাঁপাইনবাগঞ্জের ৩৮ জনের নমুনার মধ্যে আটটি পজিটিভ এসেছে।
উল্লেখ্য, ঈদের পর থেকে রাজশাহীতে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় গত ১১ জুন সিটি করপোরেশন এলাকায় এক সপ্তাহের লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। পরে সেটি দুই দফা বাড়িয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। এর পর এক জুলাই থেকে নতুন করে সরকারি ঘোষিত সাতদিনের কঠোর লকডাউন শুরু হয়।
অন্যদিক করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে রাজশাহী সদর হাসপাতালকে প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বাজেট এসেছে। করোনা ডেডিকেটেড এই হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেনসহ সাধারণ বেড ছাড়াও ১৫টি আইসিইউ বেড থাকবে।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক শামীম ইয়াজদানী বলেন, সদর হাসপাতালকে করোনা হাসপাতালে রূপান্তর করার আবেদন করা হয়েছিল। কাজের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে। আমাদের জানিয়েছে আপনারা কাজ শুরু করেন। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হবে। সেখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন থাকবে। রিপিয়ারিং কাজ শুরু হয়েছে। আরও দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে সদর হাসপাতালটি ব্যবহার করা যাবে।
রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতি নিয়ে হাসপাতাল পরিচালক শামীম ইয়াজদানী বলেন, যখন আমাদের হাসপাতালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫০ শতাংশ রোগী ছিল; তখন আমাদের লকডাউন দিতে হতো। এখন সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। লকডাউন দিতে দেরি হয়ে গেছে।
শামীম ইয়াজদানী আরও বলেন, লকডাউন দিয়ে শুধু জীবন নিয়ে চিন্তা করলে হবে না; জীবিকা নিয়েও চিন্তা করতে হবে। এ জন্য সিদ্ধান্ত নিতে সময় লেগেছে। তবে লকডাউন চলছে; আমরা আশা করছি, ফল পাবো।
তিনি আরও বলেন, এখন থেকে করোনা রোগীদের বাইরে থাকে মাস্ক কেনা লাগবে না। মাস্ক হাসপাতাল থেকে সরবারহ করা হবে।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক শামীম ইয়াজদানী জানান, হাসপাতালে গ্রামের রোগীগুলো আসছে শেষ সময়ে। তাদের মধ্যে সচেতনা কম। করোনায় কী করতে হবে, এই আইডিয়াটা তাদের নেই। তবে এখন গ্রামের মানুষও সচেতন হয়েছে। আশা করছি আক্রান্তের সংখ্যা কমবে। এছাড়া করোনা চিকিৎসায় হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।