রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর কলেজ শিক্ষককে মারধরের পর ভয়ভীতি দেখিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এনে মিথ্যাচারের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। একইসঙ্গে এ ঘটনায় ওমর ফারুক চৌধুরীর বিচার দাবি করেন তিনি।
শনিবার (১৬ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় নিজ রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে অধ্যক্ষ নির্যাতনে অভিযুক্ত এমপির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান আসাদুজ্জামান। এ সময় এমপির মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে তথ্য উপস্থাপনসহ তার অপকর্মের তথ্য তুলে ধরেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এই নেতা।
এদিকে, কলেজের অধ্যক্ষকে মারধরের ঘটনার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। ফোনালাপে এক ব্যক্তির কাছে অধ্যক্ষ মারধরের বর্ণনা দিচ্ছেন বলে শোনা যায়।
ফাঁস হওয়া ফোনালাপে শোনা যায়, এক ব্যক্তিকে এমপির হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছেন অধ্যক্ষ সেলিম রেজা। তবে অজ্ঞাত ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি। সেই কথোপকথন তুলে ধরা হলো-
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘এমপি কেন ডাকলো?’
অধ্যক্ষ: ‘এমপি ডাকেনি তো, ডেকেছে হচ্ছে সেকেন্ড এমপি রাজু (মাটিকাটা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ)। রাজু ডাকছে সকাল ৮টার সময়, প্রিন্সিপালদের এমপি সালাম দিয়েছেন। সব প্রিন্সিপাল রাত ১০টার সময় আসবে, আপনি আসেন।’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘আচ্ছা।’
অধ্যক্ষ: ‘সব প্রিন্সিপালকে এই কথা বলেছে। অনেক প্রিন্সিপাল বলছে- কী ব্যাপার। বলছে আসেন বুঝতে পারবেন। সব প্রিন্সিপালকে ডেকেছে রাজু।’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘পালপুরের প্রিন্সিপাল কী গিয়েছিল?’
অধ্যক্ষ: ‘না, না। পালপুরের প্রিন্সিপাল যায়নি, ওই যে গালাগালি করার পর থেকে সে আর যায় না। করোনার আগে নিয়োগ নিয়ে গালাগালি করেছিল এবং আমাদের পিকনিকে সবার সামনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। তারপর থেকে আর আসে না।’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘আপনাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে লাভ কী?’
অধ্যক্ষ: ‘কিচ্ছু নাই, কিচ্ছু নাই, অধ্যক্ষ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশন আমার প্রয়োজন নাই। আমরা ১২ জন অধ্যক্ষ যদি এক জায়গায় হয়; আপনি এটা অন্যায় বললেন, অন্যায় করলেন, কেউ লড়তে পারবো?’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘তারপরে ডাকলো, আপনি গেলেন?’
অধ্যক্ষ: ‘হ্যাঁ, গেলাম। আমি তো এমনি যাই না। যখন মিটিংয়ে ডাকে তখনই যাই। অন্য অধ্যক্ষরা সপ্তাহের মধ্যে তিন দিনই দেখা করে।’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘আচ্ছা।’
অধ্যক্ষ: ‘আমি আর ২৪ নগরের অধ্যক্ষ হাবিব ভাই, কোনও মিটিং না হলে যাই না।’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘আচ্ছা।’
অধ্যক্ষ: ‘এ নিয়ে তার রাগ। আর আমি যখন যাই তখন হাবিব ভাই ডেকে নেয়। বৃহস্পতিবার সেদিন হাবিব ভাই ও আমি একসঙ্গে গিয়েছি। হাবিবকে তো চেনেন?’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘হ্যাঁ, চিনি।’
অধ্যক্ষ: ‘এই দুই লোক ছাড়া সবাই ওর পা চাটা।’
অজ্ঞাত ব্যক্তি: ‘ওখানে যাওয়ার পরে?’
অধ্যক্ষ: ‘ওখানে যাওয়ার পরে শিরোইলের মজিবর ছিল। শিরোইল স্কুল এমপিওভুক্ত হওয়ার কারণে ফুল নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের লিডার ছিল, সাধারণ সম্পাদক রশিদ ভাই ছিল। তারপর ওরা বাইরে আসলো। ওমর প্লাজার পূর্ব পাশে তখন রাজু আসলো, বলছে, এমপি স্যার উঠে যাবেন, ঢুকেন ঢুকেন। ঢোকার পর বসতেই এমপি বলে, সেলিম তোমার কলেজে কী হয়েছে। আমি বলি, স্যার কিছু হয়নি। এরপর অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলে, তোর অফিসে বসে আমার নামে আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলে। তুই আমাকে না বলে, ওই শিক্ষকদের বিচার না করে— কিলঘুষি, লাথি মারতে থাকে। এরপর হকিস্টিক দিয়ে মারধর করতে থাকে।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘গত ১০ জুলাই রাতে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা আমাকে ফোন করে ঘটনা সর্ম্পকে অবহিত করেছিলেন। পরে তার বাসায় দেখা করতে গেলে অধ্যক্ষ সেলিম শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারপিটের আঘাতগুলো দেখান। ওই সময় অধ্যক্ষ সেলিম আমাকে জানিয়েছেন, তাকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে সবার সামনে কিলঘুষি দিয়ে আহত করা হয়। কোমরের নিচে হকিস্টিক দিয়ে পেটানো হয়। কিন্তু এমপির ভয়ে কেউ তাকে বাধা দেওয়ার সাহস দেখাননি।’
আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এখনও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সে যে চশমা পরে আছে সেটাও নতুন। এমপি পেটানোর সময় তার চশমা ভেঙে গিয়েছিল। এমপি ফারুক চৌধুরী শুধু সেলিম রেজাকে নয়, এমন কর্মকাণ্ড তার পুরনো অভ্যাস। এর আগেও এমন অনেকে মারধরের শিকার হয়েছেন। ভয়-আতঙ্কে কথা বলার সাহস পায় না তারা।’
এ সময় আসাদুজ্জামান আসাদ শিক্ষক সমাজের প্রতি অনুরোধে জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা জাতি গড়ার কারিগর। আপনাদের থেকে আমরা শিখবো। শিক্ষার্থীরা শিখবে। কিন্তু অন্যায়ের পরে এভাবে অস্বীকার করে আমাদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলবেন না।’
এদিকে অধ্যক্ষকে মারধরের ঘটনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত দল রাজশাহীতে এসে তাদের কাজ শেষ করে গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় ফিরে যান। তারা রাজশাহীর শিক্ষক নেতাসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথাও বলেছেন। তবে তদন্তে তারা কী পেয়েছেন, সে বিষয়ে কমিটির কেউ মুখ খোলেননি।
জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘এখন চাপে পড়ে অধ্যক্ষ মার খেয়েও অস্বীকার করছেন। তদন্ত কমিটি তদন্ত করে গেছে। আশা করছি, ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসবে।’
শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা ও রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার অধ্যক্ষ সেলিম রেজা ঘটনার পর আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি এ সময় কান্নাকাটি করে বিচারও চেয়েছিলেন। কিন্তু চাপের কারণে এবং জীবন ও চাকরির নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এখন নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। তবে আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার দাবি করছি। শিক্ষক সমিতি অচিরেই এ ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবে।’
তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোল্লা মাহফুজ আল হোসেন বলেন, ‘আমরা বৃহস্পতিবার সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছাই। সারাদিন রাজশাহীর শিক্ষক নেতাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। তদন্ত প্রতিবেদন যথাসময়ে দাখিল করা হবে। সেইসঙ্গে যথাসময়ে সাংবাদিকদের জানানো হবে।’
অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে এমপি ফারুক চৌধুরীর পাশে বসে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘এমপি আমাকে মারধর করেছেন, এ কথা ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা কয়েকজন অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ ঈদ উপলক্ষে এমপি সাহেবের অফিসে দেখা করতে গিয়েছিলাম। এ সময় আমাদের অধ্যক্ষ ফোরামের কমিটি গঠন এবং অভ্যন্তরীণ অন্যান্য বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে এমপি আমাদের নিবৃত করেন। এছাড়া অন্য কোনও ঘটনা ঘটেনি।’
মারধর করা না হলে ঘটনার রাতে চিকিৎসকের কাছে কেন গেলেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যক্ষ সেলিম রেজা বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে একটু ধাক্কাধাক্কি হয়েছিল।’
বাম চোখের নিচের কালো দাগের ব্যাপারে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি। এছাড়া তার বাম হাতের কনুইয়ের নিচে এবং কোমরের নিচের কালো দাগ দেখতে চান সাংবাদিকরা। কিন্তু অধ্যক্ষ সেলিম রেজা মারধরের আলামত দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।
এ ব্যাপারে এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘আমাকে ঘিরে বারবার চক্রান্ত হচ্ছে। এটিও সেই চক্রান্তের একটি অংশ। আমি কোনও অধ্যক্ষকে মারধর করিনি। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একশ্রেণির মানুষ আমার বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন।’
এদিকে, অধ্যক্ষকে এমপি কর্তৃক মারধর ও পরবর্তী সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার অপচেষ্টার নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাজশাহী জেলা ও মহানগর শাখা শিক্ষক-কর্মচারী সমিতি ফেডারেশন। শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজশাহী জেলা ও মহানগর শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন এক জরুরি সভায় গোদাগাড়ী উপজেলার এমপি কর্তৃক শিক্ষক নির্যাতনসহ দেশে ধারাবাহিক শিক্ষক নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে। জেলা বাকশিসের সভাপতি অধ্যক্ষ মো. শফিকুর রহমানের কাছে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন অধ্যক্ষ সেলিম রেজা। পরবর্তী সময়ে সংবাদ সম্মেলনে অধ্যক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করায় সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অধ্যক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষক-কর্মচারী সমিতি ফেডারেশন রাজশাহী ও মহানগর এ ঘটনার যথাযথ তদন্ত দাবিসহ প্রকৃত দোষীদের বিচার দাবি করছে।